সঞ্চয়পত্র থেকে কাটা করটা এখন আর হারিয়ে যায় না
|

সঞ্চয়পত্রের কেটে রাখা কর এখন ফেরতযোগ্য: কারা পাবেন, কীভাবে পাবেন

চেম্বারে প্রবীণ মক্কেলদের কাছ থেকে একটা প্রশ্ন প্রায়ই শুনতে হয়। সারা জীবনের জমানো টাকা সঞ্চয়পত্রে রাখা, মাসের মুনাফা দিয়েই সংসার চলে, অথচ প্রতিবার মুনাফা তোলার সময় সেখান থেকে কর কেটে রাখা হয়। প্রশ্নটা সোজা: আমার আয় তো করমুক্ত সীমার নিচেই, তাহলে কর কাটে কেন?

এত দিন উত্তরটা দিতে ভালো লাগত না। কাটা টাকাটাই ছিল চূড়ান্ত কর, ফেরত চাওয়ার সুযোগ আইনে ছিল না। যাঁর আয়ে আদৌ কর বসার কথা নয়, তাঁর কাছ থেকেও কেটে রাখা হতো, এবং সেটা নিয়ম মেনেই।

অর্থ আইন, ২০২৬ এই জায়গাটা বদলে দিয়েছে। অনেক পরিবারের জন্য এটা বছরে হাজার বিশেক টাকার ব্যাপার, তাই খুঁটিনাটি জেনে রাখা দরকার।

মূল কথা

  • সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কাটা কর আর চূড়ান্ত কর নয়, এখন তা অগ্রিম কর। রিটার্নে দেখালে সমন্বয় হয়, বেশি কাটা হলে ফেরত পাওয়া যায়।
  • মোট আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলে (২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ করদাতার জন্য ৪ লাখ টাকা) কেটে রাখা পুরো টাকাই ফেরতযোগ্য।
  • ফেরত পেতে রিটার্ন দিতেই হবে, সঙ্গে লাগবে সঞ্চয় অফিসের কর কর্তনের প্রত্যয়নপত্র।
  • যাঁদের আয় বেশি, তাঁদের কর কিছুটা বাড়তে পারে, কারণ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা এখন মোট আয়ের সঙ্গে যোগ হবে।

বদলটা কোথায়

উৎসে কাটা করকে আর “চূড়ান্ত করদায়” ধরা হচ্ছে না। এখন সেটা “অগ্রিম কর”।

ব্যাপারটা দোকানে বায়না দেওয়ার মতো। বায়নার টাকা দামের সঙ্গে সমন্বয় হয়। জিনিসের দাম বায়নার চেয়ে কম পড়লে বাড়তিটা ফেরত আসে। সঞ্চয়পত্রের কর কাটার ক্ষেত্রেও এখন তাই। বছর শেষে আপনার মোট করদায় হিসাব হবে, তার বিপরীতে কেটে রাখা টাকা বাদ যাবে। করদায় শূন্য হলে পুরোটাই ফেরতযোগ্য।

কাগজে শব্দ দুটোর পার্থক্য সামান্য। একজন অবসরভোগীর হাতে সেটা বছরে বিশ-পঁচিশ হাজার টাকার ব্যবধান।

কোন বছরের কাটা কর সমন্বয় করা যাবে, সে প্রশ্নও আসে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে যে রিটার্ন জমা হচ্ছে, তাতেই এই সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, আর সে জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাটা করের প্রত্যয়নপত্র বিতরণ শুরু হয়েছে। নিজের ক্ষেত্রে কোন সময়ের কর্তন হিসাবে আসবে, রিটার্ন জমার আগে একবার নিশ্চিত হয়ে নিন।

করমুক্ত আয়সীমা কত

ফেরত পাবেন কি না, তা নির্ভর করে আপনার মোট আয় করমুক্ত সীমা পেরোচ্ছে কি না তার ওপর। অর্থ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী ২০২৬-২৭ করবর্ষে সীমাগুলো এমন:

করদাতাকরমুক্ত আয়সীমা
সাধারণ করদাতা৪,০০,০০০ টাকা
নারী এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী৪,৫০,০০০ টাকা
প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা৫,২৫,০০০ টাকা
গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধা৫,৫০,০০০ টাকা

প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ সীমা ছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। জুনের শেষে অর্থবিল পাসের সময় তা বাড়িয়ে ৪ লাখ করা হয়।

কাটে কত

হার নিয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর আর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বেশ গোলমাল হয়েছিল। পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগ আছে এমন ছোট বিনিয়োগকারীদের অনেকের কাছ থেকেই ৫ শতাংশের জায়গায় ১০ শতাংশ কেটে নেওয়া হয়। দুই মাসে অতিরিক্ত কাটা পড়ে ২৫ কোটি টাকার মতো। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এনবিআর চিঠি দিয়ে বিষয়টা পরিষ্কার করে।

সেই ব্যাখ্যা অনুযায়ী হার ছিল এমন: সব ধরনের সঞ্চয়পত্র মিলিয়ে বিনিয়োগ পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে থাকলে ৫ শতাংশ, শুধু পেনশনার সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখের মধ্যে থাকলে শূন্য, আর এর বেশি হলে ১০ শতাংশ।

নতুন বাজেটের পর হার নিয়ে পত্রিকায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য এসেছে। কয়েকটি প্রতিবেদন বলছে এখন সবার জন্য ১০ শতাংশ, কয়েকটি বলছে আগের হারই থাকছে। তাই মুনাফা তোলার সময় আপনার কাছ থেকে কত কাটা হলো, ব্যাংক বা সঞ্চয় অফিস থেকে লিখিত হিসাব নিয়ে রাখুন। স্বস্তির কথা হলো, নতুন নিয়মে হার যা-ই হোক, বাড়তি কাটা টাকা রিটার্নের মাধ্যমে ফেরত চাওয়া যায়।

কারা ফেরত পাবেন

যাঁর বার্ষিক মোট আয় করমুক্ত সীমার নিচে, তিনি কেটে রাখা পুরো টাকাটাই ফেরত পাবেন। অবসরভোগী, গৃহিণী, একক আয়ের প্রবীণ নাগরিক, বেশির ভাগই এই দলে পড়েন।

যাঁর করদায় আছে কিন্তু কাটা টাকার চেয়ে কম, তিনি পার্থক্যটুকু ফেরত পাবেন।

আর যাঁর আয় বেশি, উচ্চ করহারের স্তরে পড়েন, তাঁর জন্য নতুন নিয়মে সুবিধা নেই। কেটে রাখা টাকা সমন্বয় হবে, বাকিটা রিটার্নের সময় দিতে হবে। আগে এই মুনাফা চূড়ান্ত কর দিয়েই শেষ হয়ে যেত, এখন মোট আয়ের সঙ্গে যোগ হবে। কথাটা সোজাসুজি বলে রাখা ভালো: বড় বিনিয়োগকারীর কর কিছুটা বাড়ছে।

ফেরত পাওয়ার পথ

  1. রিটার্ন দাখিল করুন। এটাই প্রথম ও প্রধান শর্ত। রিটার্ন না দিলে ফেরতের প্রশ্নই ওঠে না। যাঁরা এত দিন ভাবতেন “আমার তো কর লাগে না, রিটার্ন দিয়ে কী হবে”, তাঁদের জন্য এখন কারণ তৈরি হয়েছে।
  2. প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করুন। কত টাকা কাটা হয়েছে, তার প্রত্যয়নপত্র জেলা সঞ্চয় অফিস এবং ব্যুরো ও বিশেষ ব্যুরো অফিস থেকে দেওয়া হচ্ছে। এটাই আপনার মূল কাগজ। কেনার সময়কার কাগজ আর মুনাফা তোলার রসিদও গুছিয়ে রাখুন।
  3. রিটার্নে কাটা টাকা অগ্রিম কর হিসেবে দেখান এবং প্রত্যয়নপত্র সংযুক্ত করুন।
  4. ব্যাংক হিসাবের তথ্য ঠিকঠাক দিন। ফেরতের টাকা ওই হিসাবেই আসবে। হিসাবটি সচল কি না, নিজের নামে কি না, দেখে নিন। আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের ১২০ দিনের মধ্যে কর অফিসের যাচাই শেষ হওয়ার কথা।

হিসাবটা দাঁড়ায় কেমন

ধরুন, একজন অবসরভোগীর ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র আছে। মুনাফার হার ধরা যাক ১১.৮ শতাংশ; জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদে বিভিন্ন স্কিমের হার এর কাছাকাছি। বছরে মুনাফা দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এর ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২৩ হাজার ৬০০ টাকা, উৎসে কাটা যায়।

তাঁর যদি আর কোনো আয় না থাকে, মোট আয় করমুক্ত সীমার অনেক নিচে থাকে। তার মানে পুরো ২৩ হাজার ৬০০ টাকাই ফেরতযোগ্য, মাসে গড়ে দুই হাজার টাকার মতো। একজন অবসরভোগীর সংসারে এটা কম টাকা নয়।

মুনাফার হার দেখে খুশি হওয়ার আগে

হার আকর্ষণীয়, সন্দেহ নেই। তবে প্রকৃত লাভ বুঝতে হলে মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে দেখতে হবে। ঘোষিত হার থেকে বছরের গড় মূল্যস্ফীতি বিয়োগ করলে যা থাকে, সেটুকুই আপনার ক্রয়ক্ষমতার আসল বৃদ্ধি।

আরেকটা কথা, যেটা সাধারণত লেখা হয় না। যাঁর মাসিক খরচের বড় অংশ যায় চাল-ডাল-তেল আর বাড়িভাড়ায়, তাঁর নিজের মূল্যস্ফীতি জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। কাগজে যতটা মুনাফা দেখায়, তাঁর হাতে ততটা পৌঁছায় না।

কেনার আগে যা মাথায় রাখবেন

  • ক্রয়সীমা আছে। পাঁচ বছর মেয়াদি, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক আর পরিবার সঞ্চয়পত্র মিলিয়ে একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ, যৌথ নামে ১ কোটি টাকা। পরিবার সঞ্চয়পত্র শুধু একক নামে, সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ। পেনশনার সঞ্চয়পত্রের সীমা আলাদা। সীমার বেশি কিনলে পরে জটিলতায় পড়তে হয়।
  • মেয়াদের আগে ভাঙালে মুনাফা কমে। জরুরি প্রয়োজনের টাকাটা এখানে না রাখাই ভালো।
  • যৌথ নামে কিনলে মুনাফা কার আয় হিসেবে রিটার্নে দেখানো হবে, সেটা শুরুতেই ঠিক করে নিন। পরে ফেরত দাবির সময় এই প্রশ্ন উঠবে।

তথ্যসূত্র

  1. প্রথম আলো, “সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর অগ্রিম কর বাড়ল, মুনাফা কত কমবে”, ১২ জুন ২০২৬ — লিংক
  2. ঢাকা ট্রিবিউন, “How new changes to savings certificates will…”, ২০ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  3. যুগান্তর, সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর সমন্বয় ও প্রত্যয়নপত্র, ১৮ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  4. ঢাকা ট্রিবিউন, অর্থবিল ২০২৬ পাস ও করমুক্ত আয়সীমা, ২৯ জুন ২০২৬ — লিংক
  5. পিডব্লিউসি বাংলাদেশ, অর্থ আইন ২০২৬-এর মূল সংশোধনী — লিংক
  6. বণিক বার্তা, “পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর ৫ শতাংশই থাকছে”, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — লিংক
  7. বাংলা ট্রিবিউন, “সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অপরিবর্তিত”, ২ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  8. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, পরিবার সঞ্চয়পত্রের ক্রয়সীমা ৪৫ লাখ, ২১ জানুয়ারি ২০২৫ — লিংক

হালনাগাদ, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬: করমুক্ত আয়সীমা, ক্রয়সীমা ও ফেরতের সময়সীমা যোগ করা হয়েছে; অতিরিক্ত কর্তনের শিকার গ্রাহকের সংখ্যা নিয়ে আগের লেখায় থাকা অনুমান বাদ দেওয়া হয়েছে; নতুন অর্থবছরে কর্তনের হার নিয়ে অস্পষ্টতা উল্লেখ করা হয়েছে।

এই লেখা সাধারণ আলোচনা, কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগ বা কর পরামর্শ নয়। আমি বিনিয়োগ উপদেষ্টা নই। হার, সীমা ও করবিধি সময়ে সময়ে বদলায়; তথ্য ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর ও এনবিআরের হালনাগাদ নির্দেশনা দেখে নিন, প্রয়োজনে একজন কর আইনজীবী বা হিসাববিদের সঙ্গে কথা বলুন।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।