জামানতের দাম কে ঠিক করবে? হাইকোর্টে আটকে ২,১৫৪ রিট
ধরা যাক, ব্যবসার জন্য ব্যাংক থেকে ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন, জামানত রেখেছিলেন এক কোটি টাকার জমি। ব্যবসা খারাপ গেল, কিস্তি আটকে গেল। কয়েক বছর পর অর্থ ঋণ আদালতের রায়ে জমিটা চলে গেল ব্যাংকের নামে। ঋণ শোধ হলো, কিন্তু বাড়তি পঞ্চাশ লাখ টাকার সম্পদও হাতছাড়া হলো।
এমন অভিযোগ নিয়েই এখন হাইকোর্টে ঝুলে আছে হাজারো রিট। ব্যাংকের চোখে এগুলো দেরি করানোর কৌশল, ঋণগ্রহীতার চোখে একমাত্র প্রতিকার। সত্যটা সম্ভবত দুইয়ের মাঝামাঝি। আর সমস্যার মূলে একটা সহজ প্রশ্ন: জামানতের দাম ঠিক করে কে?
মূল কথা
- ২০২১ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত দায়ের হওয়া ঋণসংক্রান্ত ২,১৫৪টি রিট হাইকোর্টে বিচারাধীন; শুধু জানুয়ারি–মে ২০২৬-এ নতুন এসেছে ২৩৯টি।
- এর মধ্যে ১,৩৫৯টিতে প্রশ্ন একটাই: সম্পত্তির দাম ঋণের চেয়ে বেশি হলেও রায়ের পর ব্যাংক মালিকানা নিতে পারে কি না।
- অর্থ ঋণ আদালত আইনে নিলামের আগে স্বাধীন মূল্যায়নের বাধ্যবাধকতা নেই; তবে নিলামে ডিক্রির বেশি টাকা উঠলে বাড়তি অংশ ঋণগ্রহীতাকে ফেরত দিতে হয় (ধারা ৩৩(৬))।
- খেলাপির চাপে পড়লে রায়ের আগেই নিজের উদ্যোগে মূল্যায়ন, আলোচনা আর সময়মতো আইনি পরামর্শই সবচেয়ে কাজের পথ।
সংখ্যাগুলো কী বলছে
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০ জুলাই ২০২৬-এর প্রতিবেদন (সুপ্রিম কোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে) বলছে, ২০২১ সালের শুরু থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত দায়ের হওয়া ২,১৫৪টি ঋণসংক্রান্ত রিট হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এর মধ্যে ১,৩৫৯টিতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে রায়ের পর ব্যাংকের মালিকানা নেওয়াকে, যেখানে সম্পত্তির দাম খেলাপি ঋণের চেয়ে বেশি। আরও ৭৫৯টিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে মূল্যবান সম্পত্তির নিলাম নিয়ে। আদালত-সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটি বলছে, অনেক ক্ষেত্রে জামানতের বাজারমূল্য ঋণের প্রায় দ্বিগুণ।
একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। প্রতিবেদনের শিরোনামে ৮৫ হাজার কোটি টাকার কথা আছে, কিন্তু ভেতরে এই রিটগুলোর সঙ্গে জড়িত অঙ্ক বলা হয়েছে “৮,৫০০ কোটি টাকার বেশি”। তাই অঙ্কটা নিয়ে সাবধানে কথা বলাই ভালো। বড় ছবিটা অবশ্য পরিষ্কার: একই প্রতিবেদন অনুযায়ী অর্থ ঋণ আদালতে প্রায় ৭৫ হাজার মামলা বিচারাধীন।
আইন কী বলে
অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ দুই ধাপে জামানতের প্রশ্ন সামলায়।
- মামলার আগে (ধারা ১২): বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির ক্ষমতা থাকলে ব্যাংককে মামলার আগে তা বিক্রির চেষ্টা করতে হয়। না করলে আদালত ব্যাংকের নিজের দেখানো মূল্য, আর তা না থাকলে সাব-রেজিস্ট্রারের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মূল্য ধরে দাবি থেকে বাদ দেন।
- রায়ের পর (ধারা ৩৩): সিলমোহর করা দরপত্রে নিলাম, অন্তত ১৫ দিনের নোটিশ দিয়ে। নিলামে বিক্রি না হলে সম্পত্তি ডিক্রিদারের (ব্যাংকের) নামে চলে যায়, আর আদালতের সনদই মালিকানার দলিল হিসেবে গণ্য হয়।
- বাড়তি টাকা (ধারা ৩৩(৬)): নিলামে ডিক্রির চেয়ে বেশি টাকা উঠলে বাড়তি অংশ ঋণগ্রহীতাকে ফেরত দিতে হবে।
- আপিল (ধারা ৪১): রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে ঋণগ্রহীতাকে ডিক্রির ৫০ শতাংশ জমা দিতে হয়।
সমস্যাটা এখানেই। নিলামে দাম না উঠলে সম্পত্তি ব্যাংকের নামে চলে যায়, আর তখন “বাড়তি টাকা” বলে কিছু থাকে না। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়ায় সম্পত্তির বাজারমূল্য যাচাইয়ের জন্য কোনো স্বাধীন মূল্যায়নের বাধ্যবাধকতা আইনে নেই। একজন ব্যাংকিং আইন বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনে বলেছেন, আদালত রিসিভার নিয়োগ করে মূল্য যাচাই করাতে পারেন, কিন্তু সে আবেদন খুব কমই হয়; ফলে রায় দাঁড়ায় মূলত ঋণদাতার দাবির ওপর।
দুই পক্ষের যুক্তি
ব্যাংকের যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। রিট অনেক সময় সত্যিই দেরি করানোর কৌশল। বছরের পর বছর কিস্তি না দিয়ে শেষ মুহূর্তে মূল্যায়নের প্রশ্ন তোলা সবসময় সরল বিশ্বাসের কাজ নয়। আর প্রতিটি রিটে টাকা আটকে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত আমানতকারীর টাকা।
ঋণগ্রহীতার যুক্তিও শক্ত। জামানতের দাম যদি ঋণের দ্বিগুণ হয় আর ব্যাংক ঋণের সমান হিসাবে সেটা নিয়ে নেয়, তাহলে ঋণ শোধের বাইরেও একজন মানুষ বড় অঙ্কের সম্পদ হারান। সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদ সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে; সেই প্রশ্ন নিয়ে হাইকোর্টে যাওয়াকে শুধু কৌশল বলা যায় না।
আমার মত হলো, যেখানে জামানতের দাম কার্যত পাওনাদার একাই ঠিক করে, সেখানে বিরোধ কমবে না, বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ দেওয়ার সময়ের মূল্যায়নে একটা ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে: ১ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণে তালিকাভুক্ত মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠান বাধ্যতামূলক, আর ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এমন ১৩১টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হয়েছে। একই মানদণ্ড নিলাম বা মালিকানা হস্তান্তরের আগেও চালু হলে অনেক রিটের দরকারই পড়ত না।
সংস্কারের সুযোগ এখনই
৮ জুন ২০২৬ সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অর্থ ঋণ আদালত আইনের সংশোধন প্রক্রিয়াধীন। সংশোধনীর খসড়া এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তাই প্রস্তাবগুলো এখনই বলার সময়:
- নিলাম বা মালিকানা হস্তান্তরের আগে তালিকাভুক্ত স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক হোক।
- ঋণগ্রহীতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজের খরচে পাল্টা মূল্যায়ন দাখিল করতে পারবেন, আর দুটির ফারাক বেশি হলে আদালত তৃতীয় মূল্যায়ন করাবেন।
- বাড়তি টাকা ফেরতের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকুক, দেরি হলে সুদসহ।
একই সঙ্গে দেরি করানোর রিট ঠেকাতে কড়া শর্ত রাখা যায়, যেমন রিটের সঙ্গে নির্দিষ্ট অঙ্ক জমা। দুটো একসঙ্গে হলেই ব্যবস্থাটা ন্যায্য হয়। শুধু ছাঁকনি বসালে যাঁদের অভিযোগ সত্য, তাঁরাও ছেঁকে যাবেন।
আপনি ঋণগ্রহীতা হলে যা করবেন
- ঋণ নেওয়ার সময়ের মূল্যায়ন প্রতিবেদন, বন্ধকি দলিল আর মঞ্জুরিপত্রের কপি সংগ্রহ করে রাখুন। পরে দাম নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এগুলোই প্রথম প্রমাণ।
- কিস্তি আটকে যাওয়ার শুরুতেই ব্যাংকের সঙ্গে লিখিতভাবে কথা বলুন। মামলা শুরু হয়ে গেলে আলোচনার জায়গা ছোট হয়ে আসে।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের এককালীন এক্সিট সুবিধার মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। আপনার ঋণ এর আওতায় পড়ে কি না, ব্যাংকের কাছে লিখিতভাবে জানতে চান।
- মামলা চললে একটি তালিকাভুক্ত মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠান দিয়ে সম্পত্তির হালনাগাদ মূল্যায়ন করিয়ে রাখুন, আর আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতের নজরে আনুন।
- নিলামের নোটিশ পত্রিকায় এলে তারিখ আর শর্তগুলো খেয়াল করুন। নিলামে বেশি দাম উঠলে ধারা ৩৩(৬) অনুযায়ী বাড়তি টাকা ফেরত চান।
- রিট শেষ ধাপ, প্রথম নয়। খরচ আর সময় দুটোই লাগে; নিজের যুক্তি কতটা শক্ত, আগে একজন আইনজীবীর সঙ্গে বসে যাচাই করুন।
শেষ কথা
ঋণ শোধ না করার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু ঋণ শোধের নামে কারও ন্যায্য সম্পদ হারানোর পক্ষেও নেই। জামানতের দাম যত স্বচ্ছভাবে ঠিক হবে, আদালতে তত কম মামলা যাবে, আর ব্যাংকের টাকাও তত দ্রুত ফিরবে। খেলাপি ঋণের সামগ্রিক চিত্র আর দেউলিয়া আইনের অবস্থা নিয়ে পড়ুন: দেউলিয়া আইন আছে, ব্যবহার প্রায় নেই।
তথ্যসূত্র
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Mortgage valuation disputes stall recovery of Tk85,000cr in default loans”, ২০ জুলাই ২০২৬ — লিংক
- লজ অব বাংলাদেশ, অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ — লিংক
- বাংলা ট্রিবিউন, “সম্পাদকদের যা জানালেন গভর্নর”, ৮ জুন ২০২৬ — লিংক
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Money loan court: When fast track snails”, ৮ জুলাই ২০২৬ — লিংক
- দ্য ডেইলি স্টার, “BB enlists 131 collateral valuation firms to curb loan fraud”, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
- দ্য ডেইলি স্টার, “BB offers ‘special exit’ to defaulters to cut NPLs, boost credit flow”, ২৯ জুন ২০২৬ — লিংক
এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য ও মতামত, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। নিজের ঋণ বা মামলার বিষয়ে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।

অ্যাকাউন্ট থাকলে প্রতিবার তথ্য লিখতে হয় না, আর মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। লগইন বা নিবন্ধন করুন