১,১৫০ টাকার কাজে ৭০,০০০ টাকা: ভূমি অফিস ঘুষ চাইলে আইনত কী করবেন
ভূমি অফিসে কেউ সরকারি ফির বাইরে টাকা চাইলে আইনত সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো টাকা না দিয়ে প্রমাণ রাখা এবং অভিযোগ করা: দুদকের হটলাইন ১০৬, ভূমিসেবার হটলাইন ১৬১২২, অনলাইনে grs.gov.bd, অথবা লিখিতভাবে সহকারী কমিশনার (ভূমি), ইউএনও বা জেলা প্রশাসকের কাছে। সরকারি কর্মচারীর ঘুষ চাওয়া দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায় অপরাধ। শুধু নেওয়া নয়, নেওয়ার চেষ্টাও। আর অস্বস্তিকর সত্যটা হলো, টাকা দিলে দাতাও আইনের চোখে পুরোপুরি নিরাপদ নন।
প্রথম আলোর ১৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়ন ভূমি অফিস। কাজ নামজারি আর নতুন খতিয়ান খোলা। প্রতিবেদনে সরকারি ফি বলা হয়েছে ১,১৫০ টাকা; ভূমি মন্ত্রণালয়ের ফি-তালিকা যোগ করলে দাঁড়ায় ১,১৭০ টাকা। ভাইরাল ভিডিওর অভিযোগ, চাওয়া হয়েছে ৭০,০০০ টাকা, পরে দর নেমেছে ২০,০০০-এ। ইউএনও, যিনি ভূমি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বেও আছেন, অভিযুক্ত তহসিলদারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠানোর প্রস্তুতির কথা বলেছেন। অভিযুক্ত কর্মকর্তা অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, সেবাপ্রার্থী তাঁর কাছে যাননি, কাগজও জমা দেননি। অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়।
তবু অঙ্কটা থেকে চোখ সরানো কঠিন। ৭০,০০০ টাকা সরকারি ফির প্রায় ৬০ গুণ। কোনো দোকান এই হারে দাম হাঁকলে ক্রেতা পাশের দোকানে যেত। মুশকিল হলো, ইউনিয়ন ভূমি অফিসের পাশে দ্বিতীয় কোনো ভূমি অফিস নেই। ভূমি অফিসে এ ধরনের দর-কষাকষি অনেক জায়গায় এত স্বাভাবিক যে মানুষ একে “খরচাপাতি” বলে। আইন একে বলে অপরাধ।
মূল কথা
- ঘুষ নেওয়া, নিতে রাজি হওয়া বা চাওয়া দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায় অপরাধ; সাজা সর্বোচ্চ ৩ বছর, জরিমানা বা উভয়।
- ঘুষদাতাও ১৬৫ক ধারায় সহায়তার (abetment) দায়ে একই সাজার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
- অভিযোগের পথ: দুদক ১০৬, ভূমিসেবা ১৬১২২, grs.gov.bd, এসি ল্যান্ড, ইউএনও, ডিসি।
- টিআইবির জরিপে ভূমিসেবা নেওয়া পরিবারের ৪৭.৬% ঘুষ দিয়েছে, গড়ে ১১,৩১১ টাকা।
ভূমি অফিসে ঘুষ কতটা সাধারণ?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২৫ জুন ২০২৬ তাদের জাতীয় খানা জরিপ প্রকাশ করেছে। নমুনা ১৫,৭১৫টি খানা, সময়কাল নভেম্বর ২০২৪ থেকে অক্টোবর ২০২৫। ফল সংক্ষেপে:
- ৮১.৬% খানা অন্তত একটি সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার।
- ভূমিসেবায় দুর্নীতির হার ৬৬.৩%, ঘুষের হার ৪৭.৬%, গড় ঘুষ ১১,৩১১ টাকা (দ্য ডেইলি স্টার)।
- পাসপোর্টে ঘুষের হার ৭৬.৬%, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায় ৪৯.৩%।
- সব খাত মিলিয়ে বছরে ঘুষ ১২,৬৩৩.২ কোটি টাকা। নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর বোঝা উচ্চ আয়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
এর চেয়েও কড়া সংখ্যাটা অভিযোগ নিয়ে। টিআইবির হিসাবে ৫৩.৩% মানুষ জানেনই না কোথায় অভিযোগ করতে হয়। সরকারের অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে জানেন মাত্র ১.৪%। যাঁরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের ২১.৬% অভিযোগ নাকচ হয়েছে, ৫১% ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থাই হয়নি। তাই সৎ উত্তর হলো, অভিযোগ করলেই কাজ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে কীভাবে করলে সম্ভাবনা বাড়ে, সেটা জানা যায়।
ঘুষ চাওয়ার শাস্তি আইনে কী?
তিনটি আইন একসঙ্গে কাজ করে।
- দণ্ডবিধি, ১৮৬০, ধারা ১৬১: সরকারি কর্মচারী কোনো সরকারি কাজ করা বা না করার বিনিময়ে বৈধ পারিশ্রমিকের বাইরে কিছু নিলে, নিতে রাজি হলে বা নেওয়ার চেষ্টা করলে অপরাধ। সাজা সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয়। “চেষ্টা” শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ। টাকা হাতবদল না হলেও দাবিটা প্রমাণ হলে মামলা দাঁড়াতে পারে।
- দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭: ধারা ৫-এ অপরাধমূলক অসদাচরণ (criminal misconduct), সাজা সর্বোচ্চ সাত বছর, জরিমানা, আর সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত। ধারা ৪ অনুযায়ী বিচারে যদি প্রমাণ হয় অভিযুক্ত বৈধ পারিশ্রমিকের বাইরে কিছু নিয়েছেন, তাহলে ধরে নেওয়া হবে সেটা ঘুষ, যদি না তিনি উল্টোটা প্রমাণ করেন।
- দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪: দণ্ডবিধির ১৬১ থেকে ১৬৫ক-সহ এসব অপরাধ এই আইনের তফসিলভুক্ত। ধারা ২০ অনুযায়ী তফসিলভুক্ত অপরাধ তদন্ত করে কেবল দুদক।
ফৌজদারি পথের পাশাপাশি বিভাগীয় পথও আছে: কারণ দর্শানো, বিভাগীয় মামলা, বদলি বা বরখাস্ত। রাঙ্গাবালীর ঘটনায় ইউএনওর নোটিশ সেই পথেরই প্রথম ধাপ।
ঘুষ দিলে কি আমারও অপরাধ হয়?
এই প্রশ্নটা অনেকে জিজ্ঞেস করেন ফিসফিস করে, কারণ উত্তরটা আরামদায়ক নয়। দণ্ডবিধির ১৬৫ক ধারা বলছে, ১৬১ বা ১৬৫ ধারার অপরাধে যে সহায়তা করে, সে একই সাজা পাবে, অপরাধটা শেষ পর্যন্ত ঘটুক বা না ঘটুক। ঘুষ দেওয়া সাধারণত এই সহায়তার (abetment) মধ্যেই পড়ে।
১৯৪৭ সালের আইনের ধারাগুলো পড়ে আমি ঘুষদাতাকে আগাম দায়মুক্তি দেওয়ার কোনো আলাদা বিধান পাইনি। অর্থাৎ “বাধ্য হয়ে দিয়েছি” কথাটা মানবিকভাবে সত্য হতে পারে, কিন্তু আইনে সেটা স্বয়ংক্রিয় ঢাল নয়। কাকে আসামি করা হবে আর কাকে সাক্ষী, সেই সিদ্ধান্ত তদন্তকারী সংস্থার। আগে থেকে কেউ সেই নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
তাই সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থান হলো টাকা দেওয়ার আগে অভিযোগ করা। যিনি দাবি পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, তাঁর অবস্থান আর যিনি টাকা দিয়ে কাজ করিয়ে ছয় মাস পরে রাগ করে অভিযোগ করছেন, তাঁর অবস্থান আইনের চোখে এক নয়।
ঘুষ চাইলে ধাপে ধাপে কী করবেন?
- সরকারি ফি আগে জানুন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের ফি-তালিকায় নামজারিতে আবেদনের কোর্ট ফি ২০ টাকা, নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা, ডিসিআর ফি ১,১০০ টাকা, সব মিলিয়ে ১,১৭০ টাকা। অঙ্কটা হাজারের ঘরে, হাজার হাজারের ঘরে নয়।
- ফি অনলাইনে দিন, নগদে নয়। রাঙ্গাবালীর প্রতিবেদনেও অভিযোগ ছিল, ডিজিটাল পদ্ধতির বদলে নগদ চাওয়া হয়েছে। নগদ চাওয়াটাই প্রথম সতর্কসংকেত।
- প্রমাণ গুছিয়ে রাখুন। তারিখ, সময়, কে, কত চেয়েছেন লিখে রাখুন। আবেদন নম্বর, রসিদ, সঙ্গে কেউ থাকলে তাঁর নাম। নিজের কথোপকথনের অডিও বা ভিডিও অনেকে রাখেন; আদালতে তার মূল্য নির্ভর করবে কীভাবে ধারণ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে তার ওপর। মূল ফাইল অক্ষত রাখুন, সম্পাদনা করবেন না।
- টাকা দেওয়ার আগে দুদকে জানান (১০৬, টোল-ফ্রি)। এটাই ফৌজদারি পথ। আগে জানালে দুদক হাতেনাতে ধরার অভিযান চালাতে পারে, এমন অভিযানের খবর মাঝেমধ্যেই আসে।
- ভূমি মন্ত্রণালয়ের হটলাইন ১৬১২২-এ অভিযোগ করুন। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী এটি সপ্তাহে সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা খোলা। কল করার পর অভিযোগের কোনো নম্বর বা রেফারেন্স দিলে লিখে রাখুন।
- grs.gov.bd-তে লিখিত অভিযোগ দিন। পোর্টালের নিয়মে সাধারণ অভিযোগ নিষ্পত্তির সর্বোচ্চ সময় ৩০ কার্যদিবস, সন্তুষ্ট না হলে আপিল। অভিযোগ নম্বরটা সংরক্ষণ করুন।
- প্রশাসনিক সিঁড়ি বেয়ে উঠুন। ইউনিয়ন ভূমি অফিসের বিষয়ে প্রথমে উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি), সাড়া না পেলে ইউএনও, তারপর জেলা প্রশাসক। প্রতিটি আবেদনের রিসিভড কপি রাখুন।
- ফেসবুকের আগে কর্তৃপক্ষ। ভাইরাল হলে দ্রুত নোটিশ হয়, রাঙ্গাবালী তার প্রমাণ। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া নাম-পরিচয়সহ অভিযোগ ছড়ালে মানহানির দায় উঠতে পারে। সাইবার নিরাপত্তা আইনে মানহানিতে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের প্রস্তাবসহ একটি সংশোধনী খসড়াও আলোচনায় আছে (দ্য ডেইলি স্টার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
লিখিত অভিযোগে কী থাকবে?
অভিযোগ যত নির্দিষ্ট, তদন্তকারীর কাজ তত সহজ, আর উড়িয়ে দেওয়া তত কঠিন। রাগ নয়, তথ্য লিখুন। এক পাতাই যথেষ্ট:
- কোন অফিস, কোন সেবা, আবেদন নম্বর ও আবেদনের তারিখ।
- কবে, কোথায়, কোন পদের কর্মচারী কত টাকা চেয়েছেন; কী বলে চেয়েছেন, যতটা সম্ভব হুবহু।
- সরকারি ফি কত, আপনি কত দিয়েছেন (যদি দিয়ে থাকেন), রসিদ পেয়েছেন কি না।
- সাক্ষীর নাম ও ফোন নম্বর, সংযুক্ত প্রমাণের তালিকা।
- আপনার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর। বেনামি অভিযোগের পথও আছে, কিন্তু যোগাযোগের উপায় না থাকলে তদন্তকারী আপনার কাছ থেকে বাকি তথ্য নিতে পারেন না।
ঘুষ না দেওয়ায় নামজারি আটকে গেলে কী করবেন, সেটা নিয়ে আলাদা লেখা আসছে। আপাতত মনে রাখুন, আবেদনের তারিখ আর আবেদন নম্বরই আপনার দেরির সবচেয়ে বড় প্রমাণ, তাই ওগুলো হারাবেন না।
অনেক সময় ঘুষের চাপ আসে দেরি থেকে: ফাইল আটকে থাকে, আর “খরচ” দিলে এগোবে বলা হয়। নামজারি ২৮ দিনে না হলে ঘুষ না দিয়েই কী কী ধাপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলাদা লিখেছি: নামজারি ২৮ দিনে হওয়ার কথা। না হলে কী করবেন?
শেষ কথা: ভিডিও না থাকলে কী হবে?
রাঙ্গাবালীর ঘটনা আলো পেয়েছে একটা ভিডিওর কারণে। বেশির ভাগ মানুষের হাতে ভিডিও থাকে না, থাকে শুধু একটা ধারণা যে “এভাবেই চলে”। টিআইবির হিসাব সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে না: ভূমিসেবা নেওয়া প্রায় অর্ধেক পরিবার ঘুষ দিয়েছে। আর অভিযোগের সরকারি ব্যবস্থার নামই জানেন একশো জনে একজনের সামান্য বেশি।
ঘুষ কমানোর সবচেয়ে সস্তা উপায় হলো দর-কষাকষির সুযোগ কেড়ে নেওয়া। আমার প্রস্তাব: প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলা ভূমি অফিসের দরজায় বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি ফি-তালিকা, ১৬১২২, ১০৬ আর জিআরএসের ঠিকানা টাঙানো হোক, আর ভূমিসেবার সব ফি কেবল ডিজিটালি নেওয়া হোক। তারপর কোনো কর্মচারী নগদ চাইলে সেটাকেই আলাদা শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হোক। তখন প্রশ্নটা আর “কত দিলে হবে” থাকবে না। থাকবে “নগদ কেন চাইলেন”, যার উত্তর দেওয়া অনেক কঠিন।
তথ্যসূত্র
- প্রথম আলো (ইংরেজি), “‘Why Tk 70,000 needed for a Tk 1,150 service?’, tehsildar issued notice after video goes viral”, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
- টিআইবি, প্রেস বিজ্ঞপ্তি: “Corruption Affects 81.6% of Households; Passport and BRTA Services Most Prone to Bribery and Corruption”, ২৫ জুন ২০২৬ — লিংক
- দ্য ডেইলি স্টার, “Bribes rose 15.9% during interim govt”, ২৬ জুন ২০২৬ — লিংক
- Laws of Bangladesh, দণ্ডবিধি, ১৮৬০, ধারা ১৬১ — লিংক; ধারা ১৬৫ক — লিংক
- Laws of Bangladesh, The Prevention of Corruption Act, 1947 — লিংক
- ভূমি মন্ত্রণালয়, “ভূমিসেবার নির্ধারিত ফি” — লিংক
- উপজেলা ভূমি অফিস, ভৈরব (সরকারি বাতায়ন), “ভূমিসেবা পেতে এবং অভিযোগ জানাতে কল করুন ১৬১২২ নম্বরে” — লিংক
- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) — লিংক
হালনাগাদ, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬: নামজারির মোট সরকারি ফি (১,১৭০ টাকা) যোগ ও গুণফল সংশোধন।
এই লেখা সাধারণ আইনি ও নীতিগত তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

অ্যাকাউন্ট থাকলে প্রতিবার তথ্য লিখতে হয় না, আর মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। লগইন বা নিবন্ধন করুন