সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় টিকেছিল ১১৯ দিন
|

অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের গঠন, বিলুপ্তি আর আপিলের অবস্থা

জেলা আদালতের একজন বিচারককে কোথায় বদলি করা হবে, কবে পদোন্নতি হবে, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে শৃঙ্খলার ব্যবস্থা কে নেবে, এসব প্রশ্ন সাধারণ মানুষের কাছে দূরের মনে হয়। কিন্তু আপনার জমির মামলা, জামিনের শুনানি বা পারিবারিক বিরোধ যিনি শুনছেন, তাঁর চাকরির এই কাঠামোই শেষ পর্যন্ত বিচারের পরিবেশ ঠিক করে।

গত এক বছরে এই কাঠামো নিয়ে দ্রুত কয়েকটা ঘটনা ঘটেছে: একটি অধ্যাদেশে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন, সংসদে সেটি রহিত হওয়া, আর বিষয়টি নিয়ে আপিল বিভাগে মামলা। খবরগুলো আলাদা আলাদা এসেছে বলে পুরো ছবিটা অনেকের কাছে অস্পষ্ট। এই লেখায় ঘটনাক্রম, দুই পক্ষের যুক্তি আর এখনকার আইনি অবস্থা এক জায়গায় রাখা হলো।

মূল কথা

  • সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ (২০২৫ সনের ৭২ নং অধ্যাদেশ) গেজেট হয় ৩০ নভেম্বর ২০২৫; ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু।
  • ৯ এপ্রিল ২০২৬ সংসদ রহিতকরণ বিল পাস করে; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৪৭ নং আইন) অনুযায়ী সচিবালয়ের কাজ ফিরে যায় আইন ও বিচার বিভাগে।
  • ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ হাইকোর্ট সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন বাতিল করে আলাদা সচিবালয় গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন; ৯ জুন ২০২৬ আপিল বিভাগ সেই রায় স্থগিত করেন।
  • আপিল বিভাগে বিষয়টি বিচারাধীন; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বর্তমান ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যবস্থাই চলছে।

প্রশ্নটা আসলে কী

সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বর্তমান পাঠ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের বিচারকদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি আর শৃঙ্খলার দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির, যা তিনি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োগ করেন। বাস্তবে এই কাজের প্রশাসনিক দিকটা চলে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। আর ১১৬ক অনুচ্ছেদ বলছে, বিচারকার্যে বিচারকেরা স্বাধীন।

দীর্ঘদিনের বিতর্কটা হলো, এই “দ্বৈত ব্যবস্থা” বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য যথেষ্ট কি না। একপক্ষের মত, বিচারকদের চাকরির প্রশাসন পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের অধীনে থাকা দরকার। অন্যপক্ষের মত, বর্তমান পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থা নিজেই একটা ভারসাম্য, আর কাঠামো বদলের সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সংসদের।

ঘটনাক্রম

  • ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫: একটি রিট মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন বাতিল করে মূল ১৯৭২ সালের পাঠ পুনর্বহাল করেন, জুডিসিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা, ২০১৭ বাতিল করেন, আর তিন মাসের মধ্যে আলাদা সচিবালয় গঠনের নির্দেশ দেন।
  • ২০ নভেম্বর ২০২৫: উপদেষ্টা পরিষদ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ অনুমোদন করে; ৩০ নভেম্বর তা গেজেট হয়। সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির, আর সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার একজন সচিব সচিবালয়ের প্রধান।
  • ১১ ডিসেম্বর ২০২৫: তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন।
  • ৯ এপ্রিল ২০২৬: সংসদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল পাস হয়; সংশ্লিষ্ট সংশোধনী অধ্যাদেশও রহিত হয়। একই দিনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫ রহিত করার বিলও পাস হয় (২০২৬ সনের ৪৮ নং আইন)। বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য ভিন্নমত দেন।
  • ১৯ মে ২০২৬: সচিবালয়ে কর্মরত ১৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়।
  • ৯ জুন ২০২৬: আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর রায় স্থগিত করেন; রাষ্ট্রপক্ষের সময়ের আবেদনে পরে শুনানির তারিখ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঠিক হয়। এর পরের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর এখনো পাওয়া যায়নি।

সরকারের যুক্তি

রহিতকরণ বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, আলাদা সচিবালয়ের প্রয়োজনীয়তা ও কাঠামো নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আরও পরামর্শ ও যাচাই দরকার, আর প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে বিধানগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আইনমন্ত্রী সংসদে বলেন, সরকার সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থায়ী আইনি কাঠামোর জন্য সংবিধান সংশোধনবিষয়ক একটি বিশেষ কমিটির প্রস্তাবও তিনি দেন।

এই যুক্তির একটা শক্ত দিক আছে: রাষ্ট্রের তিন বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানোর মতো সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সংসদে আলোচনা করে নেওয়াই সংসদীয় ব্যবস্থার স্বাভাবিক পথ। আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষ আরও যুক্তি দিয়েছে যে ১১৬ অনুচ্ছেদের পরামর্শের বিধান নিজেই একটি ভারসাম্যের ব্যবস্থা।

সমালোচকদের যুক্তি

অন্যদিকে রিটকারী পক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, হাইকোর্টের রায় স্থগিত হওয়ার আগে পর্যন্ত তা মানা বাধ্যতামূলক ছিল, আর সচিবালয় বিলুপ্তি সেই রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, প্রকৃত বিচারিক স্বাধীনতার জন্য দ্বৈত ব্যবস্থার অবসান দরকার। একটি নাগরিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও সচিবালয় আগের অবস্থায় রাখার আবেদন করা হয়।

আমার পর্যবেক্ষণ

বিষয়টি এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন, তাই আইনি প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর আদালতই দেবেন। তবে কাঠামো যেটাই হোক, দুটি কাজ এখনই করা যায়, যার জন্য নতুন আইন লাগে না এবং যা কোনো পক্ষের অবস্থানের বিরুদ্ধে যায় না:

  • অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাজনিত সিদ্ধান্তের সংক্ষিপ্ত তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা, যাতে প্রক্রিয়া নিয়ে আস্থা বাড়ে।
  • বিকল্প কাঠামো নিয়ে কোনো বিল বা নীতি এলে পাসের আগে খসড়া প্রকাশ করে আইনজীবী, বিচারক ও নাগরিকদের মত নেওয়া।

রহিতকরণের পর বিকল্প কোনো বিলের খসড়া এই লেখা পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

বিচারপ্রার্থী হিসেবে আপনার যা জানা দরকার

  1. এই বিতর্কের কারণে আপনার মামলার আইনি অবস্থান বদলায় না। বিচারক বদলি হলে মামলা নতুন বিচারকের কাছে চলবে; আগের সাক্ষ্য ও আদেশ বহাল থাকে।
  2. বিচারক বদলির সময় অনেক ক্ষেত্রে শুনানির তারিখ পিছিয়ে যায়। তাই আপনার আইনজীবীর কাছ থেকে প্রতিটি পরবর্তী তারিখ লিখিতভাবে জেনে নিন, আর নিজেও কজলিস্ট দেখার অভ্যাস করুন।
  3. কোনো আদালতের আচরণ বা আদেশ নিয়ে আপত্তি থাকলে তার আইনি পথ হলো আপিল, রিভিশন বা বদলির আবেদন। সামাজিক মাধ্যমে বিচারকের বিরুদ্ধে প্রচারণা আপনার মামলার ক্ষতি করতে পারে, এমনকি আদালত অবমাননার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
  4. বিষয়টির অগ্রগতি জানতে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখুন; সেই রায়ই ঠিক করবে ১১৬ অনুচ্ছেদ কোন পাঠে চলবে।

শেষ কথা

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে তর্ক বাংলাদেশে পুরোনো, আর এর উত্তর এক বছরে মিলবে, এমন নয়। তবে বিচারপ্রার্থীর কাছে সবচেয়ে জরুরি জিনিস তিনটা: বিচারক যেন নির্ভয়ে রায় দিতে পারেন, মামলা যেন সময়মতো শেষ হয়, আর প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ থাকে। কাঠামো নিয়ে যে সিদ্ধান্তই আসুক, এই তিনটা মানদণ্ডে তা মাপা উচিত।

তথ্যসূত্র

  1. লজ অব বাংলাদেশ, সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ (রহিতকরণের টীকাসহ) — লিংক
  2. লজ অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ১১৬ — লিংক
  3. বাসস, “HC directs creation of separate judiciary secretariat in 3 months”, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ — লিংক
  4. ঢাকা ট্রিবিউন, “Supreme Court Secretariat Ordinance, 2025, issued”, ১ ডিসেম্বর ২০২৫ — লিংক
  5. বাসস, “JS passes Supreme Court Secretariat (Repeal) Bill, 2026”, ৯ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক
  6. দ্য ডেইলি স্টার, “15 judges removed from Supreme Court Secretariat”, ১৯ মে ২০২৬ — লিংক
  7. বাসস, “Appellate Division stays HC verdict on SC secretariat”, ৯ জুন ২০২৬ — লিংক
  8. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, “সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের বিষয়ে আপিল শুনানি ১ সেপ্টেম্বর”, ১৬ জুন ২০২৬ — লিংক
  9. বিডিনিউজ২৪, “Legal split over High Court ruling casts doubt over Supreme Court Secretariat future”, ১১ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক

এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়; কোনো রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। বিষয়টি আপিল বিভাগে বিচারাধীন; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে লেখাটি হালনাগাদ করা হবে।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।