প্রস্তাব ০১: পূর্ব-মধ্যস্থতা কাজ করছে, প্রশ্ন এখন এরপর কী

প্রস্তাব ০১: মামলার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতায় ৬২% মামলা কমেছে, এরপর কী

এটি সংস্কার প্রস্তাব সিরিজের প্রথম লেখা। প্রতিটি প্রস্তাব একই সাত-দফা কাঠামোয় লেখা: সমস্যা, এখন কী ঘটে, খরচ, প্রস্তাব, কে করবে কোন আইনে, কী আপত্তি আসবে, আর প্রথম ধাপ।

এই লেখাটা লিখতে বসেছিলাম একটা সোজা প্রস্তাব নিয়ে। দেওয়ানি মামলায় বাধ্যতামূলক পূর্ব-মধ্যস্থতা চালু হোক। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম, সেটা ইতিমধ্যেই চালু হয়ে গেছে। আর প্রাথমিক ফলাফল রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো।

প্রস্তাবটা তাই বদলে ফেলতে হলো। শুরু করা হবে কি না, সেই প্রশ্ন আর নেই। প্রশ্ন হলো, যেটা কাজ করছে সেটাকে সারা দেশে নিতে গেলে কোথায় কোথায় সাবধান থাকতে হবে।

মূল কথা

  • পারিবারিক, বাটোয়ারা, অগ্রক্রয়, বাড়িভাড়া, পিতামাতার ভরণপোষণ ও যৌতুকের মতো কিছু বিরোধে এখন মামলার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার চেষ্টা বাধ্যতামূলক।
  • মধ্যস্থতায় আপস হলে তা আদালতের ডিক্রির মতো কার্যকর; না হলে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে মামলা করা যায়।
  • পাইলট জেলাগুলোতে এসব মামলা দায়ের ৬২ শতাংশ কমেছে। তবে বিরোধ কতটা মিটেছে, সে হিসাব এখনো প্রকাশ হয়নি।
  • আমার প্রস্তাব: সারা দেশে নেওয়ার আগে মধ্যস্থতাকারীর প্রশিক্ষণ, দুর্বল পক্ষের সুরক্ষা আর প্রতি মাসের তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করা।

১. সমস্যাটা কী

২০২৬ সালের ৭ জুলাই সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬। এর মধ্যে অধস্তন আদালতেই ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি। সব আদালত মিলিয়ে দেওয়ানি মামলা ১৮ লাখ ১৩ হাজার ২৬৩টি, যার ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি অধস্তন আদালতে।

সংখ্যাগুলো এত বড় যে গা সওয়া হয়ে যায়। তাই ছোট একটা সংখ্যা বলি, যেটা মনে রাখা সহজ। অধস্তন আদালতে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৪১৪টি দেওয়ানি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।

পাঁচ বছর। জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ, ওয়ারিশি ভাগাভাগি, বাড়িভাড়ার ঝামেলা। আইনগতভাবে এর কোনোটাই জটিল নয়। তবু পাঁচ বছর।

২. এখন কী ঘটে

মধ্যস্থতা আমাদের আইনে নতুন কিছু নয়। এই মুহূর্তে দুটো আলাদা ব্যবস্থা পাশাপাশি চলছে, আর কোনটা কেন কাজ করছে সেটা বুঝতে হলে পার্থক্যটা ধরতে হবে।

মামলা দায়েরের পরের মধ্যস্থতা

দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ৮৯ক ধারা। ২০১২ সালের সংশোধনীতে “পারিবেন” বদলে “করিবেন” করা হয়, অর্থাৎ আদালতের জন্য এটি বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। লিখিত জবাব দাখিলের পর আদালত শুনানি মুলতবি রেখে বিরোধটি মধ্যস্থতায় পাঠাবেন। মধ্যস্থতাকারী হতে পারেন লিগ্যাল এইড অফিসার, পক্ষদের আইনজীবীদের সম্মতিতে মনোনীত কেউ, কিংবা জেলা জজের প্যানেলভুক্ত অবসরপ্রাপ্ত বিচারক বা প্রশিক্ষিত মধ্যস্থতাকারী। সময়সীমা ৬০ দিন, প্রয়োজনে আরও ৩০। নিষ্পত্তি না হলে মামলা আগের জায়গা থেকেই আবার চলতে থাকে।

কাগজে ব্যবস্থাটা ভালো। বাস্তবে প্রভাব সীমিত থেকেছে, আর কারণটা কাঠামোগত। ততক্ষণে মামলা দায়ের হয়ে গেছে, কোর্ট ফি গুনতে হয়েছে, আইনজীবী নিয়োগ হয়েছে, দুই পক্ষ প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। এই পর্যায়ে এসে আপস করা মানে পাড়া-প্রতিবেশীর সামনে হার স্বীকার করা। মানুষ সেটা করতে চায় না।

মামলা দায়েরের আগের মধ্যস্থতা

নতুন ব্যবস্থাটা এখানেই। আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ দিয়ে এটি চালু হয়, পরে ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদ তা আইন হিসেবে পাস করে। নির্দিষ্ট কিছু ধরনের বিরোধে এখন আদালতে যাওয়ার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা বাধ্যতামূলক। নিষ্পত্তি হলে সেটি ডিক্রির মর্যাদা পায়। না হলে চেষ্টা করা হয়েছে মর্মে প্রত্যয়ন নিয়ে মামলা করা যায়।

পাইলট জেলাগুলোর যে হিসাব প্রকাশ হয়েছে, তাতে সাত শ্রেণির বিরোধ আছে: পারিবারিক আদালত আইনের মামলা, প্রিমাইসেস রেন্ট কন্ট্রোল আইনের মামলা, বাটোয়ারা, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬ ধারার অগ্রক্রয়, অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইনের ২৪ ধারার অগ্রক্রয়, পিতামাতার ভরণপোষণ, আর যৌতুক-সংক্রান্ত মামলা। আইনের তফসিলে এর বাইরেও কিছু আইনের মামলা রাখা হয়েছে, তাই আপনার বিরোধ আওতায় পড়ে কি না, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে জিজ্ঞেস করে নিন।

২০টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছিল। ২০২৬ সালের ২১ জুলাই যুক্ত হয়েছে আরও ১০টি: বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল।

ফলাফল

পাইলট জেলাগুলোতে ওই সাত শ্রেণির মামলা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দায়ের হয়েছিল ১১ হাজার ২৮০টি। ২০২৬ সালের একই সময়ে নেমে এসেছে ৪ হাজার ২৮৪-তে। হ্রাস ৬২.০২ শতাংশ।

শ্রেণি ধরে ধরে দেখলে ছবিটা আরও পরিষ্কার। পারিবারিক আদালতের মামলা ৩,৫৫৯ থেকে ১,৭৪৪, কমেছে ৫১ শতাংশ। বাটোয়ারা ২,০০১ থেকে ৬৬১, প্রায় ৬৭ শতাংশ। যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা ৫,৬০৫ থেকে ১,৮১০, প্রায় ৬৮ শতাংশ।

তবে সংখ্যাটা যা দেখাচ্ছে আর যা দেখাচ্ছে না, দুটো আলাদা করে রাখা দরকার। মামলা দায়ের ৬২ শতাংশ কমেছে। বিরোধ ৬২ শতাংশ মিটেছে, এমন তথ্য কিন্তু কোথাও নেই। কিছু মানুষ নিশ্চয়ই মধ্যস্থতায় সমাধান পেয়েছেন। কিছু মানুষ হয়তো বাড়তি একটা ধাপ দেখে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। কে কোন দলে, সেটা না জেনে সাফল্য ঘোষণা করা যায় না।

৩. এতে খরচ কত

জট নিয়ে আলোচনায় আমরা মামলার সংখ্যা বলি। কিন্তু ওই সংখ্যাটা কার পকেট থেকে কী নিচ্ছে, সেটা আলাদা করে না দেখলে জরুরি ভাবটা তৈরি হয় না।

মামলাকারীর খরচটা সহজেই চোখে পড়ে। কোর্ট ফি, আইনজীবীর ফি, প্রতিটা তারিখে আদালতে যাওয়ার যাতায়াত। সবচেয়ে বড় খরচটা অবশ্য কোনো খাতায় ওঠে না, সেটা হারিয়ে যাওয়া কর্মদিবস। একজন দিনমজুর বা ছোট দোকানদারের কাছে প্রতিটা তারিখ মানে একদিনের রোজগার শেষ। পাঁচ বছরে তারিখ পড়ে ডজনখানেক।

রাষ্ট্রের খরচ যায় বিচারকের সময়, আদালতের সময় আর নথি ব্যবস্থাপনায়। একজন বিচারক যত ঘণ্টা একটা বাটোয়ারা মামলার তারিখ দিতে ব্যয় করেন, তত ঘণ্টা অন্য মামলা থেকে বাদ যায়।

সবচেয়ে কম আলোচিত খরচটা অর্থনীতির। বিরোধে আটকে থাকা জমি বিক্রি হয় না, বন্ধক রাখা যায় না, তার ওপর ঘর তোলা যায় না। সম্পদটা কার্যত অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে যায়। সাড়ে তিন লাখের বেশি দেওয়ানি মামলা পাঁচ বছরের বেশি ঝুলে থাকা মানে বিপুল পুঁজি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে আছে।

উদ্যোক্তারা যখন বলেন দেশে ব্যবসা করা কঠিন, তাঁরা প্রায়ই এই জিনিসটার কথাই বলছেন। চুক্তি বলবৎ করতে পাঁচ বছর লাগলে চুক্তির দাম কমে যায়। আর চুক্তির দাম কমলে বিনিয়োগের গোটা হিসাবটাই বদলে যায়।

৪. প্রস্তাব

পাইলট কাজ করছে। প্রস্তাব তাই নতুন কিছু শুরু করার নয়, যেটা চলছে সেটাকে ঠিকভাবে বড় করার।

  1. সারা দেশে সম্প্রসারণ, প্রকাশ্য সময়সূচিসহ। আইনমন্ত্রী পর্যায়ক্রমে ছয় মাসের মধ্যে বাকি জেলাগুলোতে নেওয়ার কথা বলেছেন বলে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। প্রতি মাসে কোন জেলা যুক্ত হলো তা গেজেটে ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হোক, যাতে সময়সূচি থেকে সরে গেলে সেটা বাইরে থেকে দেখা যায়।
  2. শ্রেণির তালিকা ধাপে ধাপে বাড়ানো। পরের সবচেয়ে যৌক্তিক প্রার্থী নির্দিষ্ট মূল্যসীমার নিচের চুক্তি ও অর্থ আদায়ের মামলা, আর ভোক্তা-সংক্রান্ত ছোট বিরোধ। এগুলোতে ঘটনা নিয়ে বিতর্ক কম থাকে, বিতর্ক থাকে হিসাব নিয়ে। মধ্যস্থতা এ ধরনের বিরোধেই সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
  3. মধ্যস্থতাকারীর সক্ষমতা আগে, সম্প্রসারণ পরে। ৩০ জেলায় যা সামলানো যায়, ৬৪ জেলায় আরও বেশি শ্রেণির মামলা নিয়ে তা যাবে না। দরকার একটা স্থায়ী প্যানেল, ন্যূনতম প্রশিক্ষণের মান, নিবন্ধন আর নির্দিষ্ট সম্মানী। প্রশিক্ষণহীন মধ্যস্থতাকারী দিয়ে সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে ধীরে যাওয়া ভালো।
  4. দুর্বল পক্ষের সুরক্ষা লিখিতভাবে। পারিবারিক, যৌতুক ও ভরণপোষণের মামলায় দুই পক্ষের দরকষাকষির ক্ষমতা প্রায়ই সমান থাকে না। প্রতিটি নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতাকারীর লিখিত প্রত্যয়ন থাকুক যে পক্ষ স্বাধীনভাবে সম্মতি দিয়েছেন, আইনি পরামর্শের সুযোগ পেয়েছেন, এবং চাপে পড়ে রাজি হননি। প্রয়োজনে নারীর পক্ষে আলাদা বসার ব্যবস্থা রাখা হোক।
  5. তথ্য প্রকাশ, প্রতি মাসে, জেলাভিত্তিক। কতগুলো আবেদন এসেছে, কতগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে, গড়ে কত দিনে, আর কতগুলো ব্যর্থ হয়ে পরে মামলায় গড়িয়েছে। শেষ সংখ্যাটাই সবচেয়ে জরুরি, কারণ ওটা ছাড়া বোঝার উপায় নেই মানুষ সমাধান পাচ্ছেন, নাকি নিছক হাল ছাড়ছেন।

৫. কে করবে, কোন ক্ষমতাবলে

এই প্রস্তাবের সুবিধাটা হলো, এর জন্য নতুন আইন লাগে না।

পূর্ব-মধ্যস্থতার আইনি ভিত্তি ইতিমধ্যেই আছে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এর ২০২৬ সালের সংশোধনীতে (ধারা ২১খ)। বাস্তবায়ন করছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা ও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলো।

  • জেলা ও শ্রেণি বাড়ানো যায় প্রজ্ঞাপন ও বিধির মাধ্যমে, নতুন আইন ছাড়াই
  • মধ্যস্থতাকারীর প্যানেল, প্রশিক্ষণ ও সম্মানী নির্ধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত
  • তথ্য প্রকাশের জন্য কোনো আইনি অনুমোদনই লাগে না, শুধু সিদ্ধান্ত লাগে
  • দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯ক ধারার সঙ্গে সমন্বয়ের প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা সহায়ক হবে

অর্থাৎ যা করার আছে তার প্রায় সবটাই মন্ত্রণালয় ও সংস্থার নিজস্ব ক্ষমতার ভেতরে।

৬. কী কী আপত্তি আসবে

তিনটা আপত্তি আমি নিজেই আগে থেকে শুনতে পাচ্ছি। প্রথমটা সবচেয়ে ধারালো।

আপত্তি ১: “মামলা কমেছে, কিন্তু বিচার কি পেয়েছে?”

এর একটা অংশ অকাট্য। দায়ের কমা মানেই বিরোধ মেটা নয়। বাড়তি একটা ধাপ, অফিসে যাওয়া-আসা, আরও কিছু দিন সময় নষ্ট। যাঁর হাতে সময় কম আর টাকা কম, তিনি এই পর্যায়েই হাল ছেড়ে দিতে পারেন।

উত্তরটা তর্ক দিয়ে হবে না, পরিমাপ দিয়ে হবে। নিষ্পত্তির হার, নিষ্পত্তির গড় সময়, আর ব্যর্থ হয়ে মামলায় গড়ানোর হার। এই তিনটা তথ্য প্রকাশ করলেই বোঝা যাবে কোনটা ঘটছে। এ কারণেই তথ্য প্রকাশের প্রস্তাবটাকে আমি সবচেয়ে জরুরি মনে করি; ওটা ছাড়া বাকি প্রস্তাবগুলো যাচাই করার উপায়ই থাকে না।

আপত্তি ২: “মধ্যস্থতা দুর্বল পক্ষকে চাপে ফেলবে”

ঝুঁকিটা বাস্তব, আর পারিবারিক ও যৌতুকের মামলায় সবচেয়ে বেশি। আদালতের আনুষ্ঠানিকতার একটা সুরক্ষামূলক দিক আছে। সেখানে নিয়ম আছে, নথি আছে, আপিল আছে। মধ্যস্থতার ঘরে এসবের অনেকটাই নেই, আর ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা সেখানে সহজেই কাজ করতে পারে।

এজন্যই প্রস্তাবের চার নম্বর পয়েন্টটা ঐচ্ছিক নয়। স্বাধীন সম্মতির লিখিত প্রত্যয়ন, আইনি পরামর্শের সুযোগ, আলাদা বসার ব্যবস্থা, আর শর্ত অস্বাভাবিক হলে পুনর্বিবেচনার সুযোগ। এসব ছাড়া সম্প্রসারণ করলে সংখ্যা বাড়বে, ন্যায়বিচার নয়।

আপত্তি ৩: “৮৯ক ধারা তো আছেই, আরেকটা স্তর কেন”

ধারাটা আছে, কিন্তু কাজ করছে না, আর কেন করছে না সেটা আগেই বলেছি। ৮৯ক-র মধ্যস্থতা শুরু হয় দায়েরের পরে, যখন খরচ হয়ে গেছে আর অবস্থান নেওয়া হয়ে গেছে। পূর্ব-মধ্যস্থতা কাজ করে ঠিক তার আগের মুহূর্তে, যখন কেউ এখনও কিছু হারায়নি।

তবে আপত্তির ভেতরে একটা সত্যি আছে। দুটো ব্যবস্থা একসঙ্গে চললে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। কোন বিরোধ কোন পথে যাবে, একই বিরোধ দুই জায়গায় ঘুরপাক খাবে কি না, এসব স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে আগেই ঠিক করে নেওয়া দরকার। না করলে ধাপ কমার বদলে বাড়বে।

৭. প্রথম ধাপ: ৯০ দিনে কী করা সম্ভব

নতুন আইন ছাড়া, নতুন বাজেট ছাড়া, এই তিনটা কাজ এখনই শুরু করা যায়।

  1. একটা উন্মুক্ত ড্যাশবোর্ড। চালু ৩০ জেলার মাসভিত্তিক তথ্য এক পাতায়: আবেদন, নিষ্পত্তি, গড় সময়, আর ব্যর্থতার হার। বানাতে কয়েক সপ্তাহ লাগে।
  2. মধ্যস্থতাকারীদের জন্য ন্যূনতম প্রশিক্ষণের মান ঘোষণা এবং প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ শুরু, যাতে সম্প্রসারণের সময় লোক প্রস্তুত থাকে।
  3. দুর্বল পক্ষের সুরক্ষা-প্রত্যয়নপত্র চালু করা, বিদ্যমান ৩০ জেলাতেই, বিধি সংশোধন ছাড়াই প্রশাসনিক নির্দেশনায়।

তিনটার একটাও সংসদে যেতে হবে না।

আপনার জেলায় চালু থাকলে কী করবেন

  1. আগে জেনে নিন আপনার বিরোধ আওতায় পড়ে কি না। জেলা জজ আদালত ভবনে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস আছে। সরকারি আইনি সহায়তা হেল্পলাইন ১৬৪৩০-এ ফোন করেও জানতে পারেন।
  2. আবেদনের সঙ্গে কাগজ নিন। জাতীয় পরিচয়পত্র, অপর পক্ষের নাম-ঠিকানা, আর বিরোধের কাগজ: দলিল, কাবিননামা, ভাড়ার চুক্তি বা যা প্রাসঙ্গিক।
  3. শুনানিতে নিজে উপস্থিত থাকুন। আপস প্রস্তাব ভালো করে পড়ে বুঝে তবেই সই করবেন। মনে রাখবেন, আপস হলে তা ডিক্রির মতো বাধ্যতামূলক, পরে সহজে বদলানো যায় না।
  4. আপস না হলে প্রত্যয়নপত্র নিন। ওটা ছাড়া পরে আদালতে মামলা করতে গেলে আটকে যেতে পারেন।

শেষ কথা

যে লেখাটা লিখতে বসেছিলাম, সেটা শেষ পর্যন্ত লেখা হলো না। কারণ প্রস্তাবটা আগেই বাস্তবায়িত হয়ে গেছে, আর ফলটা ভালো।

কথাটা স্বীকার করা দরকার বলে মনে করি। রাষ্ট্রের সমালোচনা করতে করতে আমাদের এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে ভালো কিছু হলে সেটা বলতে অস্বস্তি লাগে। অথচ কোনটা কাজ করেছে সেটা চিহ্নিত করতে না পারলে পরেরটা কীভাবে করব?

তাই প্রস্তাব ০১ শেষ পর্যন্ত দাঁড়াল এভাবে। ভালো একটা জিনিস শুরু হয়েছে। এখন তাড়াহুড়ো না করে, মান ঠিক রেখে, প্রতি মাসের সংখ্যা প্রকাশ করতে করতে সেটা বড় করা হোক। আর তথ্য যদি দেখায় মানুষ সমাধান পাচ্ছেন না, নিছক হাল ছাড়ছেন, তাহলে সেটাও স্বীকার করে পথ বদলানো হোক।

সংশোধনী

এই প্রস্তাবে পাঠকের যুক্তিতে কিছু বদলালে তারিখসহ এখানে যোগ করা হবে। এখন পর্যন্ত কোনো সংশোধনী নেই।

তথ্যসূত্র

  1. দ্য ডেইলি স্টার, “Over 46 lakh cases pending across courts: law minister”, ৭ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  2. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, সংসদে মামলাজট নিয়ে আইনমন্ত্রী, ৭ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  3. যুগান্তর, “মামলাজট নিরসনে মধ্যস্থতা কার্যক্রম আশাব্যঞ্জক ফল দিচ্ছে: আইনমন্ত্রী”, ২১ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  4. জাগো নিউজ (ইংরেজি), “Govt launches mandatory pre-case mediation in 10 more dists”, ২১ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  5. প্রথম আলো, “ভুক্তভোগী নারীকে মামলার আগে মধ্যস্থতায় যেতে হবে”, ৫ জুলাই ২০২৫ — লিংক
  6. দ্য ডেইলি স্টার, “Mandatory pre-litigation mediation in civil disputes”, ২০২৬ — লিংক

হালনাগাদ, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬: দেওয়ানি মামলার সংখ্যা সংশোধন (১৮ লাখ ১৩ হাজার সব আদালত মিলিয়ে, অধস্তন আদালতে ১৬ লাখ ৯০ হাজার), আইনি ভিত্তির নাম যথাযথ করা, আর “আপনার জেলায় চালু থাকলে কী করবেন” অংশ যোগ।

এই লেখা সাধারণ আলোচনা ও মতামত, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আইনি পরামর্শ নয়। এটি পড়ার মাধ্যমে আইনজীবী-মক্কেল সম্পর্ক তৈরি হয় না। পরিসংখ্যান প্রকাশিত সংবাদ ও সরকারি বক্তব্য থেকে নেওয়া, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।