৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত আছে। একটিও বসেছে কি?
|

৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত: “৯০ দিনে বিচার” আসলে কী বলে

ব্যবসায়িক চুক্তি ভাঙলে বাংলাদেশে কী হয়? এত দিন অনেকের উত্তর ছিল: কিছুই হয় না, শুধু সময় যায়। সরবরাহকারী টাকা পান না, ক্রেতা মাল পান না, আর দেওয়ানি মামলা চলে বছরের পর বছর।

২০২৬ সালে কাগজে অন্তত ছবিটা বদলেছে। বাণিজ্যিক বিরোধের জন্য আলাদা আইন হয়েছে, সারা দেশে ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত গঠিত হয়েছে, আর সবচেয়ে বেশি প্রচার পেয়েছে একটা সংখ্যা: ৯০ দিন। প্রশ্ন হলো, সংখ্যাটা আসলে কী প্রতিশ্রুতি দেয়।

মূল কথা

  • ১ জানুয়ারি ২০২৬ বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ জারি হয়; পরে সংসদ তা বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ২৩ নং আইন) হিসেবে পাস করে।
  • ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রজ্ঞাপনে ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত গঠিত হয়: ঢাকা মহানগরে ৩টি, চট্টগ্রামে ২টি, আরও ছয় মহানগরে ১টি করে, বাকিগুলো জেলায়।
  • ৯০ দিনের সময়সীমা মামলা দায়ের থেকে নয়; আদালত যেদিন চূড়ান্ত শুনানির তারিখ ঠিক করবেন, সেদিন থেকে চূড়ান্ত শুনানি শেষ করার সময়।
  • মামলার আগে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক (জরুরি অন্তর্বর্তী প্রতিকার চাইলে ব্যতিক্রম); রায়ের বিরুদ্ধে ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে যাওয়া যায়।

আইনে কী আছে

  • আওতা: আইনের ২(ঘ) ধারায় ২৪ ধরনের বাণিজ্যিক বিরোধ তালিকাভুক্ত, যার শেষটি হলো সরকার প্রজ্ঞাপনে যা যোগ করবে। হাইকোর্ট বিভাগের মূল এখতিয়ারের বিষয় আর অর্থ ঋণ আদালতের মামলা এর বাইরে।
  • বিচারক: জেলা জজ বা অতিরিক্ত জেলা জজদের মধ্য থেকে; বাণিজ্যিক আইনে শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ থাকলে অগ্রাধিকার।
  • মধ্যস্থতা: মামলা দায়েরের আগে মধ্যস্থতার পদ্ধতি মানতে হবে (ধারা ৭)। মামলা চলাকালে আদালত মধ্যস্থতায় পাঠালে ৩০ দিনে শেষ করতে হবে, প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন।
  • সময় প্রার্থনা: চূড়ান্ত শুনানির আগে কোনো পক্ষ যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখিয়ে সর্বোচ্চ তিনবার সময় চাইতে পারবেন, খরচ দিয়ে (ধারা ৯(৫))।
  • ৯০ দিন: আদালত যেদিন মামলাটি চূড়ান্ত শুনানির জন্য নির্ধারণ করবেন, সেদিন থেকে ৯০ দিনের মধ্যে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া চূড়ান্ত শুনানি শেষ করতে হবে (ধারা ৯(৬))।
  • আপিল: রায় বা আদেশের ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল বা ক্ষেত্রমতো রিভিশন (ধারা ৬(২))।

৯০ দিন গোনা শুরু কবে

এখানেই প্রথম হোঁচট। “৯০ দিনে বাণিজ্যিক বিচার” শিরোনামটা যতটা শোনায়, ধারাটা ততটা দেয় না। জবাব দাখিল, বিচার্য বিষয় গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, নথি আদান-প্রদান, এই পুরো পর্বটা ঘড়ির বাইরে। চূড়ান্ত শুনানির তারিখ পড়তে যদি দুই বছর লাগে, তারপরের ৯০ দিন সান্ত্বনা ছাড়া খুব বেশি কিছু নয়।

তবু তিনবারের বেশি সময় না দেওয়ার বিধান আর বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা বাস্তবে বড় পার্থক্য আনতে পারে, যদি আদালতগুলো কড়াভাবে তা মানে।

আইনমন্ত্রী নিজেই সংশোধনের কথা বলেছেন

২১ মে ২০২৬ ঢাকায় বাণিজ্যিক ন্যায়বিচার নিয়ে এক সেমিনারে আইনমন্ত্রী বলেন, আইনটি নতুন করে পরীক্ষা করে কিছু সংশোধন আনতে চান। তাঁর আপত্তির জায়গা নির্দিষ্ট: আইনে দেওয়ানি কার্যবিধি প্রযোজ্য রাখা হয়েছে, আর তাতে অন্য অনেক আইনের মতো এটাও নিষ্ফল হয়ে যেতে পারে।

স্বীকারোক্তিটা গুরুত্বপূর্ণ। দেওয়ানি কার্যবিধির সঙ্গে আসে তার সব বিলম্বের যন্ত্র: অন্তর্বর্তী দরখাস্ত, রিভিশন, মুলতবির নানা পথ। একই সেমিনারে তিনি একটা উদাহরণও দেন: একটি জাপানি গাড়ি প্রস্তুতকারকের সঙ্গে দশ বছরের এজেন্সি শেষ হওয়ার পর স্থানীয় এজেন্ট প্রতিষ্ঠানটির এক জাপানি নির্বাহীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেন, আর জামিন নিতে তাঁকে বাংলাদেশে আসতে হয়। বাণিজ্যিক বিরোধ ফৌজদারি পথে গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে কী বার্তা যায়, এক গল্পেই তা বোঝা যায়।

সংখ্যাগুলো কোথায়

আদালত গঠনের সাত মাস পার হয়েছে। ৭৫টি আদালতে কতগুলো মামলা দায়ের হয়েছে, কতগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে, গড়ে কত দিন লেগেছে, এই তথ্য এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না। সংশোধনীর কোনো খসড়াও প্রকাশ হয়নি।

আমার মত হলো, সংখ্যা প্রকাশ হলে দুটোর একটা ঘটবে। মামলা সত্যিই দ্রুত শেষ হলে সেটা বড় সাফল্যের খবর, সবার জানা উচিত। আর না হলে অন্তত বোঝা যাবে কোথায় আটকাচ্ছে। দুই ক্ষেত্রেই লাভ।

যা চাওয়া উচিত

  • সুপ্রিম কোর্ট প্রতি মাসে বাণিজ্যিক আদালতগুলোর দায়ের, নিষ্পত্তি ও বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুক। এর জন্য নতুন বিচারক বা বাজেট লাগে না।
  • মামলা দায়েরের তারিখ থেকেও একটা বাইরের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হোক, যাতে চূড়ান্ত শুনানির আগের পর্ব অনির্দিষ্টকাল না চলে।
  • সংশোধনীর খসড়া পাসের আগে প্রকাশ করা হোক, যাতে ব্যবসায়ী ও আইনজীবীরা মত দিতে পারেন।

আপনি ব্যবসায়ী হলে যা করবেন

  1. প্রতিটি চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির ধারা রাখুন: আগে আলোচনা, তারপর মধ্যস্থতা বা সালিস, কোন আদালত বা কোন শহর। এক লাইনের এই ধারা পরে মাসের পর মাস বাঁচায়।
  2. চালান, ডেলিভারি চালান, ইমেইল, পেমেন্টের রেকর্ড গুছিয়ে রাখুন। বাণিজ্যিক মামলায় কাগজই আসল সাক্ষী।
  3. বিরোধ হলে আগে লিখিত নোটিশ দিন, আর মধ্যস্থতার প্রস্তুতি নিন; আইনে মামলার আগে এটা বাধ্যতামূলক।
  4. চুক্তি ভাঙার বিরোধ ফৌজদারি মামলায় টেনে নেওয়ার আগে দুবার ভাবুন। আদালত এমন মামলাকে অপব্যবহার হিসেবেও দেখতে পারেন, আর সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায়।
  5. রায় বা আদেশ পেলে ৬০ দিনের আপিলের সময়সীমা মাথায় রাখুন।

শেষ কথা

একটা সংস্কারকে তার নিজের ঘোষিত লক্ষ্যে মাপা অধৈর্য নয়। বাণিজ্যিক আদালত কাজ করলে সবার আগে লাভ ছোট ও মাঝারি ব্যবসার, যাঁদের পক্ষে বছরের পর বছর মামলা টানা সম্ভব নয়। মামলার আগে মধ্যস্থতা কীভাবে চলছে, সে নিয়ে পড়ুন: মামলা ৬২ শতাংশ কমেছে। বিরোধও কি ততটা মিটেছে?

তথ্যসূত্র

  1. লজ অব বাংলাদেশ, বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ২৩ নং আইন) — লিংক
  2. লজ অব বাংলাদেশ, বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, ২০২৬ (২০২৬ সনের ০১ নং অধ্যাদেশ) — লিংক
  3. রাইজিংবিডি, “সারা দেশে ৭৫ বাণিজ্যিক আদালত গঠন, ঢাকায় ৩টি”, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — লিংক
  4. দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, “Commercial Court Act needs re-examination: Law minister”, ২২ মে ২০২৬ — লিংক
  5. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “UNDP, BIAC convene seminar to advance commercial justice reform”, ২২ মে ২০২৬ — লিংক
  6. বাসস, “Specialised commercial courts to ensure swift, affordable justice”, ২ জুন ২০২৬ — লিংক

এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য ও মতামত, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। আইন ও বিধি সময়ে সময়ে বদলায়; নির্দিষ্ট বিরোধে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।