ছোট ব্যবসার জন্য যে পাঁচটা চুক্তি লিখিত থাকা উচিত

ধরুন, দুই বন্ধু মিলে একটা ছোট এজেন্সি দাঁড় করালেন। শুরুতে টাকাটা দিলেন একজন, খাটলেন বেশি আরেকজন। তিন বছর পর ব্যবসা মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেছে, ক্লায়েন্ট আছে, অফিস আছে। এখন একজন বেরিয়ে যেতে চান।

প্রশ্নটা শুনতে সহজ: তাঁর ভাগটা কত?

উত্তরটা সহজ না। কারণ কোথাও কিছু লেখা নেই।

এ ধরনের ঝামেলা আদালত পর্যন্ত খুব কম আসে। বেশির ভাগ শেষ হয় অন্যভাবে। কথা বন্ধ হয়ে যায়, একজন ব্যবসা ছেড়ে দেন, ক্লায়েন্টের তালিকা দুই ভাগ হয়ে যায়। টাকার অঙ্কটা হয়তো বিরাট কিছু না। কিন্তু জিনিসটা আর আগের জায়গায় ফেরে না।

আর প্রায় প্রতিটা ঘটনার শুরুতে একটা বাক্য থাকে: “আরে, আমরা তো চিনি। লিখতে হবে নাকি?”

মুখের কথা কেন টেকে না

একটা ভুল ধারণা আগে পরিষ্কার করা দরকার। না লিখলেই চুক্তি অবৈধ হয়ে যায় না। চুক্তি আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী মুখের চুক্তিও বৈধ, কয়েকটা নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম বাদে।

সমস্যাটা বৈধতার না। সমস্যাটা প্রমাণের।

ঝামেলা যখন আদালতে ওঠে, বিচারকের সামনে আসল প্রশ্নটা “কে সত্যি বলছেন” না। প্রশ্নটা “কে দেখাতে পারছেন”। দুজন মানুষ দুই রকম কথা বলছেন, দুজনেই আত্মবিশ্বাসী, দুজনেরই সাক্ষী আছে। বিচারক তখন কী ধরে এগোবেন? কাগজ। ইমেইল। স্বাক্ষর।

লিখিত চুক্তি আপনাকে জিতিয়ে দেয় না। লিখিত চুক্তি ঝগড়াটাকে শুরুই হতে দেয় না। ছোট ব্যবসার জন্য দ্বিতীয়টাই বেশি কাজের, কারণ যে মামলা হয়ই না তার খরচও নেই।

আরেকটা লাভ আছে, যেটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। চুক্তি লিখতে বসলে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো এমনিতেই সামনে চলে আসে। কেউ কাজ না করলে কী হবে, লাভ কীভাবে ভাগ হবে, কেউ চলে গেলে কী। এই আলাপটা শুরুতে করলে আধা ঘণ্টা লাগে। তিন বছর পরে করলে আইনজীবী লাগে।

নিচের পাঁচটা কাগজ ছোট ব্যবসার জন্য প্রায় সবসময় দরকার হয়।

১. অংশীদারদের মধ্যে চুক্তি

ব্যবসায় আপনি একা না হলে এটাই সবচেয়ে দরকারি কাগজ। এবং এটাই সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ে।

অনেকে ভাবেন কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনের সময় যে মেমোরেন্ডাম আর আর্টিকেলস জমা দেওয়া হয়েছে, ওতেই কাজ চলে যাবে। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে জমা দেওয়া ওই কাগজ কাঠামোর কথা বলে। শেয়ার কীভাবে হস্তান্তর হবে, বোর্ড সভা কীভাবে ডাকতে হবে। কিন্তু অংশীদারিত্ব বাস্তবে যেসব প্রশ্নে ভাঙে, তার একটারও উত্তর সেখানে নেই। পার্টনারশিপ ফার্ম হলেও একই কথা। অংশীদারি আইন, ১৯৩২ কিছু ডিফল্ট নিয়ম দেয়, আপনাদের নিজেদের বোঝাপড়াটা দেয় না।

যা যা থাকা দরকার:

  • কার কত শতাংশ মালিকানা, আর কে কী দিচ্ছেন। টাকা, সম্পদ, না শ্রম
  • কে কী কাজ করবেন, ফুলটাইম না পার্টটাইম, আর কেউ কাজ না করলে কী হবে
  • কোন সিদ্ধান্তে সবার সম্মতি লাগবে, কোনটায় সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট
  • লাভ কীভাবে ভাগ হবে, আর কতটা ব্যবসায় থেকে যাবে
  • কেউ বেরিয়ে যেতে চাইলে কী হবে, আর তাঁর শেয়ারের দাম কোন হিসাবে বসবে
  • শেয়ার বাইরের কারও কাছে বিক্রির আগে বাকিদের কেনার সুযোগ থাকবে কি না
  • কারও মৃত্যু বা বড় অসুস্থতা হলে তাঁর অংশ কার কাছে যাবে
  • দুজন সমান অংশীদার একমত না হলে অচলাবস্থা ভাঙবে কীভাবে

পাঁচ নম্বরটা আলাদা করে বলি, কারণ এখানেই সবচেয়ে বেশি ব্যবসা ভাঙতে দেখেছি। “বাজারদরে” লিখে রাখা আর কিছু না লেখা প্রায় একই জিনিস। অতালিকাভুক্ত একটা ছোট কোম্পানির বাজারদর বলে বাস্তবে কিছু নেই। গত তিন বছরের গড় নিট মুনাফার একটা নির্দিষ্ট গুণিতক, নাকি নিট সম্পদের হিসাব, নাকি দুই পক্ষের সম্মতিতে একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের মূল্যায়ন। যেটাই হোক, আগে ঠিক করে রাখুন। লিখতে এক লাইন লাগে। না লিখলে ওই এক লাইনের পেছনেই বছরের পর বছর চলে যায়।

২. কর্মীর নিয়োগপত্র

এটা শুধু ভালো অভ্যাস না, আইনে বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী নিয়োগকর্তাকে শ্রমিককে নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দিতে হয়। তবু আমাদের অসংখ্য ছোট প্রতিষ্ঠানে মানুষ কাজে যোগ দেন শুধু একটা মৌখিক আলাপের ভিত্তিতে, আর বেতনের অঙ্কটা থাকে হোয়াটসঅ্যাপে।

শ্রম আইনে সম্প্রতি বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে জারি হওয়া সংশোধনী অধ্যাদেশ ও তার ধারাবাহিকতায় আসা পরিবর্তনগুলোতে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, ট্রেড ইউনিয়ন-সংক্রান্ত বৈষম্যের বিধান কড়া হয়েছে, আর চাকরি শেষে শ্রমিককে “ব্ল্যাকলিস্ট” করা নিষিদ্ধ হয়েছে। আপনার নিয়োগপত্রের নমুনাটা যদি কয়েক বছরের পুরোনো হয়, এখন সেটা হালনাগাদ করে নেওয়ার সময়।

নিয়োগপত্রে থাকা দরকার:

  • পদ, যোগদানের তারিখ, কর্মস্থল
  • শ্রমিকের শ্রেণি। স্থায়ী, শিক্ষানবিশ, অস্থায়ী না মৌসুমি
  • শিক্ষানবিশকাল কত দিন, আর সে সময়ের শর্ত
  • বেতন ভেঙে লেখা। মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা আলাদা করে
  • কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, বার্ষিক ছুটির হিসাব
  • কোন পক্ষ কত দিনের নোটিশে চাকরির অবসান ঘটাতে পারবে
  • গোপনীয়তা, আর চাকরি ছাড়ার সময় প্রতিষ্ঠানের জিনিসপত্র ফেরতের শর্ত

এখানে সবচেয়ে দামি ভুলটা হয় শ্রেণি নিয়ে। কাগজে যা-ই লিখুন, আইনের চোখে সম্পর্কটা ঠিক হয় বাস্তবতা দিয়ে। কাউকে “কনসালট্যান্ট” লিখে রাখলেন, অথচ তিনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে আসেন, আপনার নির্দেশে কাজ করেন, আপনার ল্যাপটপ ব্যবহার করেন, মাস শেষে বাঁধা টাকা পান। ঝামেলা হলে তাঁকে শ্রমিক হিসেবেই ধরা হতে পারে, নোটিশ আর পাওনার পুরো দায়সহ। শব্দ বদলে দায় এড়ানো যায় না।

আর নোটিশের মেয়াদ নিয়ে একটা কথা। স্থায়ী মাসিক বেতনভুক্ত শ্রমিকের ক্ষেত্রে শ্রম আইনে নির্ধারিত মেয়াদটা যথেষ্ট লম্বা। নিয়োগপত্রে তার চেয়ে কম লিখে রাখলে সেটা কাজে আসবে না। আইনের নিচে নামা যায় না, ওপরে ওঠা যায়।

৩. সরবরাহ বা ক্রয়ের চুক্তি

যাঁরা মাল কেনেন বা বানান, তাঁদের ঝামেলাটা প্রায় সবসময় একই জায়গায় আটকায়। মালটা কি কথামতো হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আগে থেকে ঠিক করা মাপকাঠির ওপর। মাপকাঠি না থাকলে উত্তরও নেই, শুধু দুই পক্ষের দাবি আছে।

চুক্তিতে যা থাকা দরকার:

  • পণ্যের বিবরণ। মাপ, উপাদান, গ্রেড। দরকার হলে নমুনা বা ছবি জুড়ে দিন
  • পরিমাণ, আর কম-বেশি কতটুকু মেনে নেওয়া হবে
  • দাম, আর কোন কারণে দাম বদলাতে পারে। কাঁচামালের দর, ডলারের রেট, শুল্ক
  • ডেলিভারির সময়, জায়গা, আর পরিবহনের খরচ কার
  • মাল বুঝে নেওয়ার পর কত দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে ফেরত দেওয়া যাবে
  • পেমেন্ট। অগ্রিম কত, বাকিটা কখন, দেরি হলে সুদ বা জরিমানা আছে কি না
  • সরবরাহে দেরি হলে কী। নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ, না বাতিলের অধিকার
  • মালিকানা আর ঝুঁকি ঠিক কোন মুহূর্তে হাতবদল হচ্ছে

পাঁচ নম্বরটা ছোট মনে হলেও এটাই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে। পরীক্ষা করে ফেরত দেওয়ার সময়সীমা লেখা না থাকলে ক্রেতা ছয় মাস পরেও বলতে পারেন মাল খারাপ ছিল, আর বিক্রেতা বলতে পারেন তখন তো কিছু বলেননি। সাত দিন হোক বা দশ, একটা সংখ্যা লিখে রাখলে তর্কের জায়গাটাই থাকে না।

৪. ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজের চুক্তি

এজেন্সি, কনসালট্যান্ট, ঠিকাদার, সফটওয়্যার ফার্ম। সেবা বিক্রি করে এমন ব্যবসার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় এমন কাজে, যার জন্য কেউ টাকা দেয়নি।

চুক্তিতে থাকা দরকার:

  • কাজের পরিধি। কী কী করবেন, আর কী কী করবেন না
  • কী কী ডেলিভার করবেন, কোন তারিখে
  • পেমেন্ট কোন ধাপে কত শতাংশ
  • কতবার সংশোধন ফ্রি, তারপর কী হারে
  • ক্লায়েন্টের দায়িত্ব। তথ্য, অনুমোদন বা কনটেন্ট সময়মতো না দিলে ডেডলাইন কীভাবে সরবে
  • কাজের মালিকানা কার, পুরো টাকা পাওয়ার আগে আর পরে
  • দুই পক্ষের চুক্তি ভাঙার অধিকার, আর তখনকার হিসাব

এখানে দুটো জিনিস সবচেয়ে বেশি টাকা খায়।

প্রথমটা পরিধির অস্পষ্টতা। “ওয়েবসাইট বানিয়ে দেব” লিখে রাখলে কয় পাতা, কয়বার বদলানো যাবে, লেখা আর ছবি কে দেবে, কিছুই ঠিক হয় না। যা করবেন না সেটা লিখে রাখা যা করবেন তার চেয়ে বেশি জরুরি।

দ্বিতীয়টা মালিকানা। ডিজাইন, কোড, লেখা, ছবি। পুরো টাকা পাওয়ার পর জিনিসটা ক্লায়েন্টের হবে কি না, আপনি নিজের পোর্টফোলিওতে দেখাতে পারবেন কি না, এগুলো চুক্তিতেই লিখে ফেলুন। ডিফল্ট নিয়ম কী হবে সেটা নিয়ে পরে তর্ক করার চেয়ে আগে দুই লাইন লেখা সহজ।

৫. দোকান বা অফিস ভাড়ার চুক্তি

জায়গা ছাড়া ব্যবসা হয় না, অথচ এই চুক্তিটাই সবচেয়ে অবহেলায় হয়। বহু ক্ষেত্রে একটা ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে দুই অনুচ্ছেদ লিখে কাজ সারা হয়।

একটা কথা বিশেষভাবে মনে রাখবেন। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১০৭ ধারা অনুযায়ী এক বছরের বেশি মেয়াদের ইজারা বা বাৎসরিক ভিত্তিতে ইজারা কেবল নিবন্ধিত দলিলেই করা যায়। পাঁচ বছরের জন্য জায়গা নিচ্ছেন, ডেকোরেশনে বড় টাকা ঢালছেন, অথচ কাগজটা নিবন্ধিত না। এই মিলটা বিপজ্জনক, আর আমাদের এখানে খুব সাধারণ।

চুক্তিতে থাকা দরকার:

  • জায়গার সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও মাপ
  • মেয়াদ, নবায়নের শর্ত, আর কত দিন আগে জানাতে হবে
  • ভাড়া, বাড়ানোর হার, আর কত বছর পরপর বাড়বে
  • অগ্রিম বা জামানত কত, আর কী শর্তে ফেরত পাবেন
  • বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, সার্ভিস চার্জ কে দেবে
  • মেরামতের কোনটা মালিকের দায়, কোনটা আপনার
  • সাবলেট বা ব্যবসা হস্তান্তরের অনুমতি আছে কি না
  • জায়গা ছাড়ার নোটিশ কত দিনের

জামানত ফেরতের শর্তটা লিখতে ভুলবেন না। কত দিনের মধ্যে ফেরত দিতে হবে, কী কী কারণে কেটে রাখা যাবে, আর সেই কাটার হিসাব কে দেবে। এটা লেখা না থাকলে জামানত কার্যত মালিকের কাছেই থেকে যায়, আর অঙ্কটা ছোট ব্যবসার জন্য কখনোই ছোট না।

নবায়নের শর্তটাও একই রকম জরুরি। মেয়াদ শেষে কী হবে লেখা না থাকলে, ব্যবসা যখন সবচেয়ে ভালো চলছে ঠিক তখনই আপনি সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে দরকষাকষি করতে বসবেন।

পাঁচটাতেই যা বাদ পড়ে

উপরের চুক্তিগুলো আলাদা, কিন্তু কয়েকটা জিনিস পাঁচটাতেই থাকা দরকার। আর পাঁচটাতেই সেগুলো সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ে। ঝামেলা বাধলে প্রথমে কী হবে তারপর কী, কোন পক্ষ কত দিনের নোটিশে চুক্তি শেষ করতে পারবে, কাজের সূত্রে জানা তথ্য নিয়ে কী করা যাবে না, বন্যা বা অবরোধের মতো পরিস্থিতিতে দায় কার, আর নোটিশ কোন ঠিকানায় কোন মাধ্যমে পাঠালে বৈধ ধরা হবে। অন্য পক্ষ বিদেশি হলে কোন দেশের আইন চলবে সেটাও লিখে রাখতে হয়।

বিরোধ নিষ্পত্তি নিয়ে একটা সতর্কবার্তা দিই। সালিস আইন, ২০০১-এর অধীনে চুক্তিতে সালিসি ধারা রাখা যায়, আর বড় বাণিজ্যিক চুক্তিতে সেটা প্রায়ই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু ছোট অঙ্কের ঝামেলায় সালিস আপনাআপনি সস্তা বা দ্রুত কিছু না। সালিসকারীর ফি, ভেন্যু, আইনজীবীর খরচ মিলিয়ে অনেক সময় ঝামেলার অঙ্কটাই ছাড়িয়ে যায়। ছোট ব্যবসার জন্য বাস্তবসম্মত কাঠামো সাধারণত ধাপে ধাপে। প্রথমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দুই পক্ষের সরাসরি আলোচনা, না হলে মধ্যস্থতা, তারপর সালিস বা আদালত। ধাপগুলো লিখে রাখুন, আর প্রতিটার জন্য একটা সময়সীমা দিন।

কাগজ বানানোর সময় যেসব ছোট ভুল হয়

চুক্তির ভাষা যত ভালোই হোক, কয়েকটা জায়গায় গড়বড় হলে কাগজটা দুর্বল হয়ে পড়ে।

ভাষা। দুই পক্ষ যে ভাষায় সত্যিই পড়তে পারেন, সেই ভাষায় লিখুন। ইংরেজিতে লেখা চুক্তি অন্য পক্ষ না বুঝে সই করলে সেটা পরে আপনার দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। দরকার হলে দুই ভাষায় করুন, আর কোন সংস্করণটা প্রাধান্য পাবে সেটা লিখে দিন।

স্ট্যাম্প আর নিবন্ধন। স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯-এর আওতায় নানা ধরনের দলিলে স্ট্যাম্প শুল্ক লাগে। কম স্ট্যাম্পে করা দলিল আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে নিতে জটিলতা তৈরি করে। হার সময়ে সময়ে বদলায়, তাই সই করার আগে চলতি হারটা দেখে নিন। আর যেসব দলিল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, সেগুলো নিবন্ধন না করলে কাগজ থাকা আর না থাকা প্রায় একই।

সই আর সাক্ষী। প্রতি পাতায় দুই পক্ষের সই বা আদ্যক্ষর দিন। পরে পাতা বদলে ফেলার অভিযোগ ঠেকানোর সবচেয়ে সহজ উপায় এটাই। কোম্পানির পক্ষে যিনি সই করছেন তাঁর সেই ক্ষমতা আছে কি না দেখে নিন। দুজন সাক্ষী রাখুন, নাম-ঠিকানা আর এনআইডি নম্বরসহ।

কপি আর তারিখ। সই করা মূল কপি প্রত্যেক পক্ষের কাছে একটা করে থাকবে। স্ক্যান করে আলাদা জায়গায় রেখে দিন। আর তারিখ দিন। তারিখবিহীন চুক্তি আশ্চর্যরকম বেশি দেখা যায়, আর আশ্চর্যরকম অকেজো।

কখন নিজে পারবেন, কখন আইনজীবী লাগবে

সব চুক্তির জন্য আইনজীবী লাগে না। এটা বলাটাই সৎ কথা।

সাধারণ ক্রয়াদেশ, ছোট সেবা চুক্তি, স্বল্পমেয়াদি ভাড়া, নিয়োগপত্র। এগুলো নিজেই সামলাতে পারবেন, যদি একবার একটা ভালো কাঠামো বানিয়ে নেন আর সেটাই বারবার ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট থেকে টেমপ্লেট নামিয়ে হুবহু বসিয়ে দেবেন না। বেশির ভাগই অন্য দেশের আইনের জন্য লেখা, আর সেসব ধারা এখানে চলে না।

আইনজীবীর কাছে যাওয়া উচিত যখন:

  • ব্যবসায় একাধিক মালিক আছেন। অংশীদারদের চুক্তিতে কার্পণ্য করার জায়গা নেই
  • চুক্তির অঙ্ক আপনার কয়েক মাসের আয়ের সমান বা বেশি
  • মেয়াদ এক বছরের বেশি, কিংবা নিবন্ধন লাগতে পারে
  • অন্য পক্ষ বিদেশি, বা প্রযোজ্য আইন বাংলাদেশের বাইরে
  • জমি, ভবন বা বড় সম্পদ জড়িত
  • অন্য পক্ষ নিজেদের খসড়া দিয়েছে, আর আপনি সই করার আগে বুঝতে চান কী কী ছেড়ে দিচ্ছেন

শেষ কারণটা সবচেয়ে কম ব্যবহার হয়, অথচ সবচেয়ে সাশ্রয়ী। অন্যের খসড়া একবার পড়িয়ে নেওয়ার খরচ, দুই বছর পরে ওই খসড়া নিয়ে মামলা লড়ার খরচের একটা ভগ্নাংশ মাত্র।

শেষ কথা

লিখিত চুক্তি অবিশ্বাসের চিহ্ন না। বরং উল্টো। এটা সেই কাগজ যেটা সম্পর্কটাকে স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেয় না। মানুষ ভুলে যায়, পরিস্থিতি বদলায়, আর দুই বছর আগের একটা মৌখিক বোঝাপড়া দুজনের মাথায় দুই রকম হয়ে থাকে। কেউ মিথ্যা না বলেও।

মুখের কথা বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখে না। লিখিত চুক্তি রাখে।

এই লেখাটি সাধারণ আলোচনা ও মতামত, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আইনি পরামর্শ নয়। এটি পড়ার মাধ্যমে আইনজীবী-মক্কেল সম্পর্ক তৈরি হয় না। নিজের ব্যবসার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন। আইন ও বিধি সময়ে সময়ে বদলায়; লেখাটি সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছে আগস্ট ২০২৬-এ।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *