এআই দিয়ে চুক্তি লিখছেন? বাংলাদেশের আইনে যে ভুলগুলো ধরা পড়ে না
বাড়িভাড়ার চুক্তি, ফ্রিল্যান্স কাজের চুক্তি, ছোট ব্যবসার অংশীদারি চুক্তি, এখন অনেকেই এআইকে বলছেন, “একটা চুক্তি লিখে দাও।” কয়েক সেকেন্ডে সুন্দর গোছানো একটা খসড়া চলে আসে: ধারা নম্বর, সংজ্ঞা, সই করার জায়গা, সব ঠিকঠাক।
সমস্যা হলো, দেখতে নিখুঁত হওয়া আর আদালতে টেকা এক জিনিস নয়। এআই যেসব লেখা থেকে শিখেছে, তার বড় অংশ অন্য দেশের আইনে লেখা চুক্তি। ফলে সে বাংলাদেশের জন্যও সেই ধাঁচের ধারা লেখে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। আর আত্মবিশ্বাসী ভুল ধরা সবচেয়ে কঠিন, বিশেষ করে যিনি পেশাগতভাবে চুক্তি পড়েন না তাঁর পক্ষে।
মূল কথা
- এআই খসড়ার কাঠামো, ভাষা সহজ করা আর কোনো জরুরি বিষয় বাদ পড়েছে কি না দেখতে ভালো সহকারী; চূড়ান্ত আইনি যাচাইয়ের বিকল্প নয়।
- চুক্তি আইনের ২৭ ধারায় ব্যবসা বা পেশায় বাধা দেওয়ার চুক্তি সাধারণত বাতিল; বিদেশি টেমপ্লেটের “প্রতিযোগিতা-নিষেধ” ধারা এখানে প্রায়ই টেকে না।
- ৭৪ ধারা অনুযায়ী চুক্তিতে লেখা জরিমানার পুরোটা আদালত সাধারণত দেন না; দেন যুক্তিসঙ্গত ক্ষতিপূরণ, লেখা অঙ্কের মধ্যে।
- জমি বিক্রির বায়নাপত্র লিখিত ও নিবন্ধিত হতে হয়, সম্পাদনের ৬০ দিনের মধ্যে (রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭ক ধারা); এআই এটা প্রায়ই উল্লেখ করে না।
এআই যেখানে সত্যিই কাজে লাগে
- কাঠামো ও প্রথম খসড়া: কোন কোন ধারা থাকা দরকার, তার একটা তালিকা আর প্রাথমিক ভাষা।
- ভাষা সহজ করা ও অনুবাদ: ইংরেজি চুক্তির বাংলা সারাংশ, বা জটিল বাক্য সহজ করা।
- যা বাদ পড়েছে তা ধরা: “এই চুক্তিতে কি নোটিশের ধারা আছে? বিরোধ নিষ্পত্তির ধারা আছে?” এমন প্রশ্নে এআই ভালো সাহায্য করে।
- লম্বা চুক্তির সারসংক্ষেপ: সই করার আগে মূল দায়িত্ব, টাকা আর সময়সীমা এক নজরে দেখা।
যেখানে এআই ভুল করে, আর সাধারণ পাঠক ধরতে পারেন না
- প্রযোজ্য আইন ও এখতিয়ার: বিদেশি টেমপ্লেটে লেখা থাকে “নিউইয়র্কের আইন” বা “ইংল্যান্ডের আদালত”। দুই বাংলাদেশি পক্ষের ছোট চুক্তিতে এমন ধারা থাকলে বিরোধের সময় কোথায় মামলা হবে, তা নিয়েই আলাদা বিরোধ শুরু হয়।
- প্রতিযোগিতা-নিষেধ (নন-কমপিট): চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর ২৭ ধারা বলছে, কাউকে বৈধ পেশা, ব্যবসা বা কাজ করতে বাধা দেওয়ার চুক্তি সেই পরিমাণে বাতিল। ব্যতিক্রম মূলত একটাই: ব্যবসার সুনাম (গুডউইল) বিক্রির সময় নির্দিষ্ট এলাকায় একই ব্যবসা না করার যুক্তিসঙ্গত শর্ত।
- জরিমানা ধারা: চুক্তি ভাঙলে “দিনপ্রতি ৫ শতাংশ জরিমানা” বা “পুরো অগ্রিম বাজেয়াপ্ত” লেখা থাকলেই তা পাওয়া যায় না। ৭৪ ধারা অনুযায়ী আদালত যুক্তিসঙ্গত ক্ষতিপূরণ দেন, চুক্তিতে লেখা অঙ্কের সীমার মধ্যে।
- আদালতে যাওয়ার পথ বন্ধ করা: “কোনো পক্ষ কখনো মামলা করতে পারবে না” ধরনের ধারা ২৮ ধারায় বাতিল। তবে বিরোধ সালিসে পাঠানোর চুক্তি বৈধ, তাই সঠিক ভাষায় সালিসের ধারা লিখতে হয়।
- নিবন্ধন ও স্ট্যাম্প: জমি বিক্রির বায়নাপত্র লিখিত, দুই পক্ষের সই করা ও নিবন্ধিত হতে হয় (রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭ক ধারা)। স্ট্যাম্প ছাড়া বা কম স্ট্যাম্পে করা দলিল সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহারে জটিলতা হয়। এআই সাধারণত স্ট্যাম্প বা নিবন্ধনের কথা বলে না।
- নোটিশ ও সমাপ্তি: শুধু ইমেইলে নোটিশ, বা অবাস্তব ঠিকানা; চুক্তি শেষ করার পদ্ধতি অস্পষ্ট। বিরোধের সময় প্রথম প্রশ্নই হয়, নোটিশ ঠিকভাবে গিয়েছিল কি না।
তিনটা উদাহরণ (কল্পিত, কিন্তু খুব চেনা)
- চাকরির চুক্তি: একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান এআই দিয়ে চুক্তি বানাল, যাতে লেখা, চাকরি ছাড়ার পর দুই বছর কর্মী দেশের কোথাও একই ধরনের কাজ করতে পারবেন না। ২৭ ধারার কারণে এই শর্ত আদালতে টেকার সম্ভাবনা খুব কম। প্রতিষ্ঠানের আসল দরকার ছিল গোপন তথ্য আর গ্রাহক তালিকা সুরক্ষা; সেটা আলাদা গোপনীয়তার ধারা দিয়ে অনেক ভালোভাবে করা যেত।
- সরবরাহ চুক্তি: চুক্তিতে লেখা, ডেলিভারি দেরি হলে দিনপ্রতি চুক্তিমূল্যের ৫ শতাংশ জরিমানা। দুই মাস দেরিতে “জরিমানা” দাঁড়াল চুক্তিমূল্যের তিন গুণ। ৭৪ ধারা অনুযায়ী আদালত দেবেন যুক্তিসঙ্গত ক্ষতিপূরণ; লেখা অঙ্কের পুরোটা নয়। শুরু থেকেই বাস্তবসম্মত ক্ষতিপূরণের হার আর সর্বোচ্চ সীমা লিখলে বিরোধই কমত।
- জমির বায়না: দুই পক্ষ এআই দিয়ে সুন্দর একটা বায়নাপত্র বানিয়ে সাদা কাগজে সই করে টাকা লেনদেন করলেন, নিবন্ধন করলেন না। পরে বিক্রেতা পিছিয়ে গেলে ক্রেতা পড়লেন বড় ঝামেলায়, কারণ আইনে বায়নাপত্র নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।
এআই ব্যবহার করবেনই? সই করার আগে এই চেকলিস্ট
- প্রযোজ্য আইন বাংলাদেশের কি না, আর বিরোধ হলে কোথায় যাবেন (কোন আদালত, নাকি সালিস, কোন শহরে), তা স্পষ্ট লেখা আছে কি না দেখুন।
- প্রতিযোগিতা-নিষেধ, দিনপ্রতি জরিমানা বা “কখনো মামলা করা যাবে না” ধরনের ধারা থাকলে আবার ভাবুন বা পেশাদার কাউকে দেখান।
- টাকার অঙ্ক, মুদ্রা, কিস্তির তারিখ আর কর বা ভ্যাট কে দেবে, তা মিলিয়ে দেখুন।
- নোটিশের ঠিকানা ও পদ্ধতি বাস্তবসম্মত কি না: ডাক, হাতে হাতে, ইমেইল, সবগুলোর উল্লেখ থাকুক।
- দলিলটি নিবন্ধন বা স্ট্যাম্প লাগার মতো কি না (জমি, ভাড়া, বায়না, আমমোক্তারনামা), জেনে নিন।
- এআই কোনো আইনের ধারা বা মামলার রেফারেন্স দিলে তা লজ অব বাংলাদেশ ওয়েবসাইটে মিলিয়ে দেখুন; এআই অনেক সময় অস্তিত্বহীন রেফারেন্সও বানিয়ে দেয়।
- গোপনীয় ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত তথ্য এআই টুলে দেওয়ার আগে ভাবুন।
শেষ কথা
এআই চুক্তির খসড়া করার চমৎকার সহকারী, কিন্তু আইনজীবী নয়। ঝুঁকিটা এই নয় যে এআই খারাপ লেখে; ঝুঁকি হলো, সে ভুল দেশের আইনের ভাষায় নিখুঁতভাবে লেখে। ছোট চুক্তিতে চেকলিস্টটা মেনে চলুন। টাকার অঙ্ক বড় হলে, জমি জড়িত থাকলে বা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক হলে, সই করার আগে একবার পেশাদার চোখে দেখিয়ে নিন। বিরোধ হলে কোথায় যাবেন, পড়ুন: ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত: “৯০ দিনে বিচার” আসলে কী বলে।
তথ্যসূত্র
- লজ অব বাংলাদেশ, চুক্তি আইন, ১৮৭২, ধারা ২৭ — লিংক
- লজ অব বাংলাদেশ, চুক্তি আইন, ১৮৭২, ধারা ২৮ — লিংক
- লজ অব বাংলাদেশ, চুক্তি আইন, ১৮৭২, ধারা ৭৪ — লিংক
- লজ অব বাংলাদেশ, রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮, ধারা ১৭ক — লিংক
- লজ অব বাংলাদেশ, স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯ — লিংক
এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য, কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি বিষয়ে আইনি পরামর্শ নয়। উদাহরণগুলো কল্পিত। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ।

অ্যাকাউন্ট থাকলে প্রতিবার তথ্য লিখতে হয় না, আর মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। লগইন বা নিবন্ধন করুন