প্রস্তাব ০২: ব্যবসা নিবন্ধনের সময়সীমা কাগজে আছে, দপ্তরে নেই

প্রস্তাব ০২: ব্যবসা নিবন্ধনের সময়সীমা কাগজে আছে, দপ্তরে নেই

সংস্কার প্রস্তাব সিরিজের দ্বিতীয় লেখা। প্রতিটি প্রস্তাব একই সাত-দফা কাঠামোয় লেখা: সমস্যা, এখন কী ঘটে, খরচ, প্রস্তাব, কে করবে কোন আইনে, কী আপত্তি আসবে, আর প্রথম ধাপ।

ব্যবসা নিবন্ধনের ভোগান্তি নিয়ে আলোচনা সাধারণত এক জায়গায় গিয়ে থামে। আইন করে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হোক।

কথাটা যুক্তিসঙ্গত শোনায়। মুশকিল হলো, সময়সীমা বাঁধাই আছে।

ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন, ২০১৮-এর অধীনে করা বিধিমালায় প্রতিটা সেবার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া আছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হিসাবে নাম ছাড়পত্র আর টিআইএন-ভ্যাট নিবন্ধন এক দিনে, কোম্পানির নিবন্ধন সনদ এক সপ্তাহের মধ্যে। সিটি করপোরেশনগুলোও ২০১৮ সালে ২৪ ঘণ্টায় ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। অর্থাৎ কাগজে একটা কোম্পানি দাঁড় করাতে সপ্তাহ দেড়েকের বেশি লাগার কথা নয়।

বাস্তবে লাগে দুই থেকে তিন সপ্তাহ। মক্কেলকে আমি সাধারণত তিন সপ্তাহই বলে রাখি, কারণ কম বললে পরে কৈফিয়ত দিতে হয়।

এই ফাঁকটা নিয়েই এই লেখা। শেষে এখন কোম্পানি খুলতে চাইলে কী করবেন, সেটাও ধাপে ধাপে দিয়েছি।

মূল কথা

  • বিধিমালায় নাম ছাড়পত্র এক দিনে আর নিবন্ধন সনদ এক সপ্তাহে দেওয়ার কথা; বাস্তবে সময় লাগে কয়েক গুণ।
  • সময়সীমা না মানলে কী হবে, বিধিতে তা লেখা নেই। দেরির জন্য কারও জবাবদিহি তৈরি হয় না।
  • প্রস্তাব: সময় পেরোলে আপনাআপনি অনুমোদন, ধাপগুলো পাশাপাশি চালানো, আর প্রতি মাসে দপ্তরভিত্তিক হিসাব প্রকাশ।
  • আরজেএসসির নতুন অনলাইন ব্যবস্থায় কয়েক ঘণ্টায় নিবন্ধনের লক্ষ্য ঘোষণা হয়েছে; সেটা মাপার ব্যবস্থাও দরকার।

১. সমস্যাটা কী

বিশ্বব্যাংকের বি-রেডি সূচকের ২০২৪ সংস্করণে ৫০টি অর্থনীতির তথ্য আছে। বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিক ক্রম দেয় না, তবে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হিসাবে বাংলাদেশ ২৯তম। ক্রমের চেয়ে ভেতরের ভাঙানিটা বেশি কাজের। সূচকের তিন স্তম্ভে বাংলাদেশের নম্বর মোটেও সমান নয়। পরিচালনগত দক্ষতায় ৭০ দশমিক ৪৯, নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় ৫৬ দশমিক ৯৯, আর সরকারি সেবায় মাত্র ৪১-এর ঘরে।

সংখ্যাগুলো একটা নির্দিষ্ট কথা বলছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কাজ মোটামুটি চালিয়ে নিচ্ছে। নিয়ম-কানুনও ভয়াবহ কিছু নয়। সবচেয়ে বড় ঘাটতিটা রাষ্ট্রের সেবা দেওয়ার জায়গায়।

বিধিতে যা লেখা আছে আর দপ্তরে যা ঘটে, দূরত্বটা ঠিক সেখানেই।

২. এখন কী ঘটে

একটা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি দাঁড় করাতে উদ্যোক্তাকে কার্যত পাঁচটা আলাদা দপ্তরের দরজায় যেতে হয়। যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) নাম ছাড়পত্র ও নিবন্ধনের জন্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড টিআইএনের জন্য, ভ্যাট কমিশনারেট বিআইএনের জন্য, সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা ট্রেড লাইসেন্সের জন্য, আর একটা তফসিলি ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) হিসাবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্ল্যাটফর্মে ৪৭টি সংস্থার ১৪২টি সেবা যুক্ত ছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আরও সাতটি সিটি করপোরেশনকে যুক্ত করার চুক্তি হয়েছে। কাঠামোটা দুর্বল নয়। তবু নতুন উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতা বদলায়নি, আর কারণ তিনটা।

এক. ধাপগুলো একটার পর একটা, পাশাপাশি নয়

নিবন্ধন সনদ না পাওয়া পর্যন্ত ব্যাংক হিসাব খোলা যায় না। ব্যাংক হিসাব ছাড়া কোথাও কোথাও ট্রেড লাইসেন্সের আবেদন আটকে যায়। আর ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ভ্যাট নিবন্ধন শেষ হয় না। প্রতিটা ধাপ নিজে নিজে দ্রুত হলেও শিকলটা লম্বা হয়ে যায়। চার দিনের তিনটা ধাপ পরপর বসালে বারো দিন। একসঙ্গে চললে চার।

দুই. সময়সীমা আছে, না মানলে কিছু হয় না

বিধিমালায় দিনসংখ্যা লেখা আছে, কিন্তু সেই দিন পেরিয়ে গেলে কী হবে তা লেখা নেই। আবেদন আপনাআপনি অনুমোদিত হয় না। কর্মকর্তার জবাবদিহি তৈরি হয় না। আবেদনকারীর হাতে কোনো প্রতিকারও আসে না। এমন সময়সীমা আসলে একটা প্রত্যাশা, তার বেশি কিছু নয়।

তিন. ব্যবস্থাটা বড় বিনিয়োগ প্রকল্পকে মাথায় রেখে বানানো

ওয়ান স্টপ সার্ভিসের নকশা মূলত শিল্প ও বিনিয়োগ প্রকল্পের জন্য। অথচ প্রতি বছর যত নতুন ব্যবসা নিবন্ধিত হয়, তার বড় অংশ সাধারণ দেশীয় ছোট প্রতিষ্ঠান, যাদের কোনো প্রকল্প নিবন্ধন নেই। তাদের জন্য পুরোনো বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়াটাই রয়ে গেছে।

৩. এতে খরচ কত

বিলম্বের হিসাব আমরা দিনে করি। উদ্যোক্তার কাছে খরচটা কিন্তু শুধু সময়ের নয়।

সরাসরি ব্যয়টা চোখে পড়ে: নিবন্ধন ফি, ট্রেড লাইসেন্স ফি, স্ট্যাম্প ও নোটারি, আর প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই একজন মধ্যস্বত্বভোগীর সম্মানী। প্রক্রিয়া যত অস্বচ্ছ, এই শেষ খরচটা তত বেশি। উদ্যোক্তা নিজে ধাপগুলো বোঝেন না বলেই এমন কাউকে খোঁজেন যিনি বোঝেন, আর সেই না-বোঝার দামটা তাঁকেই গুনতে হয়।

তারপর আছে থেমে থাকার খরচ। নিবন্ধন শেষ না হলে ব্যাংক হিসাব নেই। ব্যাংক হিসাব না থাকলে বিনিয়োগ নেওয়া যায় না, আনুষ্ঠানিক চুক্তি করা যায় না, প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা যায় না। তিন সপ্তাহ ধরে প্রতিষ্ঠানটা আছে, কিন্তু কিছু করতে পারছে না। এদিকে অফিসভাড়া আর বেতনের ঘড়ি ততক্ষণে চালু হয়ে গেছে।

সবচেয়ে বড় খরচটা অবশ্য অন্য জায়গায়, আর সেটা কোনো খাতাতেই ওঠে না। যে উদ্যোক্তার সামনে তিন সপ্তাহের ভোগান্তি আর অনিশ্চিত ব্যয়, তিনি অনেক সময় ঠিক করেন নিবন্ধন ছাড়াই চালিয়ে যাবেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটা ব্যাংকঋণের বাইরে থাকে, করজালের বাইরে থাকে, বড় ক্রয়াদেশ আর রপ্তানির সুযোগের বাইরে থাকে। রাষ্ট্র রাজস্ব পায় না, উদ্যোক্তাও বাড়তে পারেন না।

তাই নিবন্ধন প্রক্রিয়ার আসল দামটা যাঁরা নিবন্ধন করেছেন তাঁদের হিসাবে পাওয়া যাবে না। ওটা লুকিয়ে আছে যাঁরা করেননি, তাঁদের হিসাবে।

৪. প্রস্তাব

নতুন সময়সীমা লাগবে না। যেটা আছে সেটাকে কার্যকর করার ব্যবস্থা লাগবে। পাঁচটা কাজের কথা বলছি।

  1. নীরব সম্মতির বিধান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না এলে আবেদনটি অনুমোদিত বলে গণ্য হবে, আর আবেদনকারী আপনাআপনি একটা ডিজিটাল প্রত্যয়ন পাবেন। শুরুতে শুধু নাম ছাড়পত্রের মতো কম ঝুঁকির ধাপে প্রয়োগ করা যায়।
  2. ধাপগুলো পাশাপাশি চালানো। নিবন্ধন সনদ ইস্যু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টিআইএন, বিআইএন ও ট্রেড লাইসেন্সের আবেদন আপনাআপনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চলে যাবে। উদ্যোক্তাকে একই তথ্য চারবার দিতে হবে না, আর একটা ধাপের জন্য অন্যটা বসে থাকবে না।
  3. দেশীয় ছোট প্রতিষ্ঠানকে একই কাঠামোর ভেতরে আনা। সময়াবদ্ধ সেবার সুবিধা কেবল বিনিয়োগ প্রকল্পের জন্য তুলে রাখার যুক্তি নেই। নতুন নিবন্ধিত প্রতিটা কোম্পানিকে ওই একই সময়সীমার আওতায় আনা হোক।
  4. ট্রেড লাইসেন্স আজীবন, নবায়ন বছরে বছরে নয়। বার্ষিক নবায়ন কার্যত ফি আদায়ের একটা প্রক্রিয়া, এতে যাচাইয়ের কিছু ঘটে না। লাইসেন্স আজীবন বৈধ থাকুক, ফি বছরে বছরে জমা হোক, আর তথ্য বদলালে সংশোধনের বাধ্যবাধকতা থাকুক। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২০২৩ সালেই পাঁচ বছর মেয়াদি লাইসেন্স চালু করেছে, আর ২০২৬ সালের আগস্টে পাঁচ বছরে একবার নবায়নের ঘোষণা এসেছে। কাজেই এটা অবাস্তব কিছু নয়; দরকার সারা দেশে একই নিয়ম।
  5. মাসভিত্তিক সম্মতি-প্রতিবেদন প্রকাশ। প্রতিটা দপ্তর প্রতি মাসে জানাবে কতগুলো আবেদন এসেছে, কতগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়েছে, গড়ে কত দিন লেগেছে, আর সবচেয়ে দীর্ঘ বিলম্বটা কত দিনের ছিল।

৫. কে করবে, কোন ক্ষমতাবলে

পাঁচটার মধ্যে চারটার জন্যই নতুন আইন লাগে না।

  • ধাপগুলো পাশাপাশি চালানো, তথ্য বিনিময় আর অভিন্ন আবেদনপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর প্রশাসনিক সমন্বয়ের বিষয়; ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইনের কর্তৃত্ব এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট
  • সময়াবদ্ধ সেবার পরিধি বাড়ানো যায় বিধি ও প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে
  • সম্মতি-প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য কোনো আইনি অনুমোদন লাগে না, শুধু সিদ্ধান্ত লাগে
  • ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিধি ও আদর্শ কর তফসিলের বিষয়, যা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বদলানো যায়
  • শুধু নীরব সম্মতির বিধানটি কার্যকর করতে হলে ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন বা বিধিমালায় স্পষ্ট সংযোজন লাগবে

অর্থাৎ সংসদে যেতে হবে একটামাত্র বিষয়ে। বাকিটা নির্বাহী সিদ্ধান্তেই সম্ভব।

সুযোগটাও এখন সামনে। কোম্পানি আইনের তৃতীয় সংশোধনীর খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে, আর ব্যবসায়ীরা নিবন্ধন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ৩০ দিনের সময়সীমা ও তা না মানলে আপনাআপনি অনুমোদনের দাবি তুলেছেন। নীরব সম্মতির বিধান যোগ করার উপযুক্ত সময় এটাই।

৬. কী কী আপত্তি আসবে

তিনটা আপত্তি আসবে বলে ধরে নিচ্ছি।

আপত্তি ১: “নীরব সম্মতিতে ভুয়া প্রতিষ্ঠান বাড়বে”

আশঙ্কাটা অমূলক নয়, তবে এতে একটা ধারণার গোলমাল আছে। নিবন্ধন মানে কারও কাজকর্মকে বৈধ ঘোষণা করা নয়, শুধু তার অস্তিত্বটা খাতায় তোলা। প্রতারণা ঠেকাতে হয় নিবন্ধনের পরে যাচাই করে আর ধরা পড়লে কড়া শাস্তি দিয়ে, আবেদন আটকে রেখে নয়।

বাস্তব চিত্রটা বরং উল্টো। এখনকার যাচাই মূলত কাগজপত্র সম্পূর্ণ আছে কি না দেখা, কে কী উদ্দেশ্যে কোম্পানি খুলছেন তা খুঁজে দেখা নয়। ফলে দেরিটা সৎ উদ্যোক্তাকে ভোগায়, অসৎ লোককে আটকায় না। নমুনা ধরে নিবিড় যাচাই, তথ্য মিলিয়ে দেখা, আর ধরা পড়লে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। এই তিনটা মিলিয়ে যা হয়, সবার ওপর অপেক্ষা চাপিয়ে তা হয় না।

আপত্তি ২: “দপ্তরগুলোর সক্ষমতা নেই”

সম্ভবত সত্যি, আর কথাটা স্বীকার করে নেওয়াই ভালো। জনবল, প্রশিক্ষণ আর তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা বাস্তব।

তবে তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এই আপত্তিটা যাচাই করার উপায় নেই। কোন দপ্তরে কত আবেদন জমছে, কতজন কর্মী তা সামলাচ্ছেন, প্রকৃত বাধাটা কোথায়। এসব না জানলে সক্ষমতার সত্যিকারের ঘাটতি আর কাজ না করার অজুহাত একই রকম শোনায়। এ কারণেই প্রস্তাবের পাঁচ নম্বর পয়েন্টটাকে আমি সাজিয়ে রাখার জিনিস মনে করি না। তথ্যে যদি সত্যিই ঘাটতি ধরা পড়ে, তাহলে বাড়তি সম্পদ চাওয়ার শক্ত ভিত্তিও তৈরি হবে।

আপত্তি ৩: “৭২ ঘণ্টা অবাস্তব লক্ষ্য”

এর উত্তর সরকারের নিজের পরিকল্পনাতেই আছে। আরজেএসসি নতুন অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থা (ইবিআরএস) চালু করছে, যার লক্ষ্য কয়েক ঘণ্টায় কোম্পানি নিবন্ধন; ২০২৭ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করার কথা। প্রশ্নটা তাই লক্ষ্য বাস্তবসম্মত কি না তা নয়। প্রশ্ন হলো, ঘোষিত লক্ষ্য মানা হচ্ছে কি না, সেটা কে গুনবে।

আর সময়সীমাটা যদি সত্যিই অবাস্তব হয়ে থাকে, তাহলে সৎ কাজটা হবে সেটা সংশোধন করে বাস্তবসম্মত একটা সংখ্যা বসানো এবং সেটা মেনে চলা। অর্জন করা যাবে না জেনেও বিধিতে একটা সংখ্যা বসিয়ে রাখলে গোটা নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাটাই কমে যায়।

৭. প্রথম ধাপ: ৯০ দিনে কী করা সম্ভব

আইন সংশোধনের অপেক্ষা না করেও তিনটা কাজ শুরু করা যায়।

  1. সম্মতি-প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করা। নিবন্ধন-সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান একটা উন্মুক্ত পাতায় প্রকাশ করা হোক। কাজটা প্রযুক্তিগতভাবে সামান্য, কিন্তু ফলটা অনেক বড়।
  2. নথির তালিকা চূড়ান্ত করে গেজেটভুক্ত করা। কোন ধাপে ঠিক কোন কাগজ লাগবে তা প্রকাশ করে পরিপত্র জারি হোক যে ওই তালিকার বাইরে অতিরিক্ত নথি চাওয়া যাবে না। অনির্দিষ্ট চাহিদাই দেরি আর বাড়তি খরচের প্রধান উৎস।
  3. নাম ছাড়পত্রে নীরব সম্মতির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ। ঝুঁকি প্রায় শূন্য, কারণ নাম ছাড়পত্র কোনো অধিকার সৃষ্টি করে না। কাজ করলে পরের ধাপে সম্প্রসারণের ভিত্তি তৈরি হয়।

এখন কোম্পানি খুলতে চাইলে যা করবেন

সংস্কার যত দিনে হয় হোক, আজ যাঁরা কোম্পানি খুলছেন তাঁদের জন্য কয়েকটা কাজের কথা:

  1. নাম ছাড়পত্র দিয়ে শুরু। আরজেএসসির ওয়েবসাইটে (roc.gov.bd) নামের আবেদন করুন। দুই-তিনটা বিকল্প নাম ভেবে রাখুন, প্রথমটা না-ও মিলতে পারে।
  2. কাগজ আগে গুছিয়ে রাখুন। সংঘস্মারক ও সংঘবিধি, পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি, আর নিবন্ধিত অফিসের ঠিকানার কাগজ। অসম্পূর্ণ কাগজই দেরির সবচেয়ে বড় কারণ।
  3. সনদ পেলেই বাকি আবেদন একসঙ্গে। কোম্পানির টিআইএন, ভ্যাট নিবন্ধন (বিআইএন), ট্রেড লাইসেন্স আর ব্যাংক হিসাবের কাগজ আগে থেকেই তৈরি রাখুন, যাতে সনদ হাতে পাওয়ার দিনই সব আবেদন করা যায়।
  4. প্রতিটা আবেদনের রসিদ ও তারিখ রাখুন। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত তাগিদ দিন। সরকারি সেবায় অভিযোগ জানানোর জন্য অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (grs.gov.bd) আছে।

শেষ কথা

সিরিজের প্রথম প্রস্তাবটা লিখতে গিয়ে দেখেছিলাম, যেটা প্রস্তাব করতে চেয়েছিলাম সেটা আগেই চালু হয়ে গেছে। এবারের অভিজ্ঞতা একটু আলাদা, তবে অচেনা নয়। এখানে বিধান আছে, সময়সীমা আছে, প্ল্যাটফর্মও আছে। নেই শুধু দুটো জিনিস: সময় না মানলে কী হবে তার বিধান, আর কাজটা আদৌ হচ্ছে কি না তার প্রকাশ্য হিসাব।

প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে আমাদের আলোচনায় একটা পুরোনো অভ্যাস আছে। প্রতিটা সমস্যার উত্তরে নতুন আইন চাই, নয়তো নতুন কর্তৃপক্ষ। অথচ বহু ক্ষেত্রে দরকারি বিধানটা আগে থেকেই আছে, শুধু সেটা মানা হচ্ছে কি না তা কেউ গুনছে না।

গোনা শুরু হলে অনেক কিছু বদলায়। যেটা কেউ মাপে না, সেটার জন্য কাউকে জবাবও দিতে হয় না।

সংশোধনী

এই প্রস্তাবে পাঠকের যুক্তিতে কিছু বদলালে তারিখসহ এখানে যোগ করা হবে। এ পর্যন্ত কোনো সংশোধনী নেই।

তথ্যসূত্র

  1. দ্য ডেইলি স্টার, “Strengthening integrated one-stop service for investors”, ৫ মে ২০২১ — লিংক
  2. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Bangladesh ranks 29 in World Bank’s B-READY index”, ৪ আগস্ট ২০২৪ — লিংক
  3. বিডা, ওএসএস-এ নতুন পাঁচ সেবা যুক্ত, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ — লিংক
  4. দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, “Companies to be registered within hours”, ৩১ আগস্ট ২০২৬ — লিংক
  5. দ্য ডেইলি স্টার, “Businesses seek 30-day deadline for RJSC to decide applications”, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
  6. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা দক্ষিণে পাঁচ বছরে একবার ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, ১৬ আগস্ট ২০২৬ — লিংক

হালনাগাদ, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬: বিধিমালার সময়সীমা সংশোধন (নিবন্ধন সনদ এক দিনে নয়, এক সপ্তাহে), ওএসএস-এর সর্বশেষ সেবাসংখ্যা, আরজেএসসির নতুন অনলাইন ব্যবস্থা, ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত আর “এখন কোম্পানি খুলতে চাইলে যা করবেন” অংশ যোগ।

এই লেখা সাধারণ আলোচনা ও মতামত, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আইনি পরামর্শ নয়। এটি পড়ার মাধ্যমে আইনজীবী-মক্কেল সম্পর্ক তৈরি হয় না। তথ্য ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ; ফি ও প্রক্রিয়া সময়ে সময়ে বদলায়।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।