রিটার্নে ৩০ ভরি সোনা? এবার বিক্রিতে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স
হ্যাঁ। জুনের শেষে পাস হওয়া অর্থ আইন অনুযায়ী সোনা বিক্রির লাভে এখন ৫ শতাংশ মূলধনি মুনাফা কর (capital gains tax) দিতে হবে। বাজেটে প্রস্তাব ছিল ১৫ শতাংশ। লাভ মানে বিক্রয়মূল্য থেকে অর্জন মূল্য বাদ দিয়ে যা থাকে। তাই রিটার্নে বছরের পর বছর লেখা “৩০ ভরি সোনা, মূল্য অজানা” লাইনটা এখন আর নিরীহ অভ্যাস নয়।
চেম্বারে প্রশ্নটা প্রায়ই এভাবে আসে: “আম্মার বিয়ের গয়না, দাম কীভাবে জানব?” প্রশ্নটা ন্যায্য। সমস্যা হলো, এত দিন অনেক রিটার্নে সোনার লাইনটা লেখা হতো ঠিক এই অজ্ঞতার সুবিধা নিতে।
সোনা এ দেশের পরিবারগুলোর পুরোনো ও নিরাপদ সঞ্চয়, এ নিয়ে তর্ক নেই। কিন্তু কিছু রিটার্নে সোনা ছিল আরেকটা জিনিস: ভবিষ্যতের ব্যাখ্যা জমা রাখার লকার। নতুন নিয়ম সেই লকারে তালা দিয়েছে।
মূল কথা
- সোনা বিক্রির লাভে ৫ শতাংশ মূলধনি মুনাফা কর; প্রস্তাব ছিল ১৫ শতাংশ।
- লাভ হিসাব হবে বিক্রয়মূল্য বিয়োগ অর্জন মূল্য; তাই কেনার দামের প্রমাণ জরুরি।
- গয়না কেনায় এখন ভরিপ্রতি নির্দিষ্ট ২,৫০০ টাকা ভ্যাট।
- রিটার্নে বাড়িয়ে দেখানো “অজানা মূল্যের” সোনা এখন সুবিধা নয়, ঝুঁকি।
সোনা বিক্রিতে এখন ঠিক কত কর দিতে হবে?
দ্য ডেইলি স্টারের ৩০ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চূড়ান্ত অর্থ আইনে সোনা, গয়না ও ডিজিটাল মুদ্রা বিক্রির লাভে মূলধনি মুনাফা কর প্রস্তাবিত ১৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (২৯ জুন) জানায়, এত দিন ব্যক্তির সোনা বিক্রির লাভে কর ছিল না। এখন বিক্রয়মূল্য আর অর্জন মূল্যের পার্থক্যটাই করযোগ্য মূলধনি মুনাফা।
প্রথম আলোর ১৪ জুনের প্রতিবেদনে ধারণাগত বদলটা পরিষ্কার: সোনা এখন আর শুধু ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিস নয়, মূলধনি সম্পদ। গলার হার আইনের চোখে এখন শেয়ারের আত্মীয়।
রাখার মেয়াদ নিয়ে একটা প্রশ্ন ছিল। বাজেট প্রস্তাবে, টিবিএসের ১৪ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ বছরের বেশি রাখা সোনায় বিশেষ হার আর ৫ বছরের কম হলে সাধারণ আয়করের হার প্রযোজ্য হওয়ার কথা ছিল। কর-পরামর্শ প্রতিষ্ঠান ট্যাক্সপার্ট বিডির ৮ আগস্টের বিশ্লেষণ বলছে, চূড়ান্ত আইনে সোনা কত দিন রাখা হয়েছে তাতে কিছু যায় আসে না, হার ৫ শতাংশই। বড় অঙ্কের বিক্রির আগে অর্থ আইনের মূল পাঠ বা একজন কর-পেশাজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
কর কখন লাগে: রাখলে, বদলালে, না বেচলে?
প্রতিবেদনগুলোর ভাষা হলো বিক্রির লাভে কর। অর্থাৎ আলমারিতে সোনা রেখে দিলে প্রতিবছর দাম বাড়ার জন্য আলাদা কর দেওয়ার কথা বলা হয়নি। কর আসে বিক্রির দিন, আর লাভটা দেখাতে হয় সেই বছরের রিটার্নে। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী নিয়মটি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ব্যক্তির রিটার্নে দেখানো সোনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
ধূসর জায়গাটা অন্যখানে। আমাদের দেশে পুরোনো গয়না জুয়েলার্সে দিয়ে নতুন গয়না নেওয়া খুব সাধারণ। দোকান পুরোনো সোনার দাম ধরে নতুনটার দাম থেকে বাদ দেয়। কাগজে এটা দেখতে প্রায় বিক্রির মতো। এটাকে এনবিআর “বিক্রি” ধরবে কি না, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি। যতক্ষণ ব্যাখ্যা না আসে, বদলের সময়ও দোকান থেকে লিখিত রসিদ নিন: পুরোনো সোনার ওজন, ক্যারেট, ধরা দর, আর নতুন গয়নার বিবরণ। পরে কোনো প্রশ্ন উঠলে এই এক পাতাই আপনার উত্তর।
সোনা কেনার খরচে কী বদলাল?
ডেইলি স্টার জানায়, আগে গয়নায় দামের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট ছিল। এখন সোনা ও প্লাটিনামে ভরিপ্রতি নির্দিষ্ট ২,৫০০ টাকা, রুপায় ভরিপ্রতি ১০০ টাকা, হীরায় গ্রামপ্রতি ২,৫০০ টাকা। তুলনা করলে বোঝা যায়। জুন ২০২৬-এ সোনার দাম ছিল ভরিপ্রতি প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। শুধু সেই দামের ওপর ৫ শতাংশ ধরলেও ভ্যাট দাঁড়াত ১১ হাজার টাকার বেশি।
দামের ওঠানামাও মনে রাখার মতো। জুন ২০২৫-এ ভরি ছিল ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা, জানুয়ারি ২০২৬-এ রেকর্ড ২ লাখ ৮৬ হাজার, জুন ২০২৬-এ ২ লাখ ২৪ হাজার। দাম কোন দিকে যাবে, সে ভবিষ্যদ্বাণী এই লেখার কাজ নয়। কাজ হলো বোঝানো: যত বেশি ওঠানামা, অর্জন মূল্যের প্রমাণ তত মূল্যবান। কেনার সময়ের আরেকটা বদল: অর্থ আইন, ২০২৬-এর সারসংক্ষেপে পিডব্লিউসি জানিয়েছে, সোনা, রুপা, গয়না ও প্লাটিনাম কেনায় উৎসে কর ৫ থেকে কমে ০.৫ শতাংশ হয়েছে।
রিটার্নে ৩০ ভরি “অজানা মূল্যের” সোনা কেন এখন বিপদ?
টিবিএসের ১৪ জুনের প্রতিবেদনে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, অনেকের করনথিতে যে পরিমাণ সোনা দেখানো, বাস্তবে তাঁদের কাছে তা নেই। রিটার্নে সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ ভরি সোনা “অজানা মূল্যে” দেখানো হয়। পরে অপ্রদর্শিত সম্পদ সামনে এলে বলা হয়, “সোনা বেচেছি।” ঢাকা ট্রিবিউনের বাংলা সংস্করণ এনবিআর সূত্রে লিখেছে, ব্যক্তি করদাতাদের রিটার্নে যত সোনা দেখানো হয়, তত সোনা পুরো দেশেই নেই।
এটাই সেই পুরোনো অভ্যাস: সোনা দিয়ে কালো টাকা সাদা। এটা কোনো গোষ্ঠীর দোষ নয়, একটা ফাঁকের দোষ। ফাঁক ছিল বলেই অভ্যাস তৈরি হয়েছে। এখন হিসাব উল্টে গেছে। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, অর্জন মূল্য দেখানো না থাকলে পুরো বিক্রয়মূল্যই মুনাফা ধরা হতে পারে। যে সোনা আপনার নেই, তা “বিক্রি” দেখালে এখন কর দিতে হবে। আর যে সোনা আছে, তার দাম “অজানা” লিখে রাখলে বিক্রির দিন পুরো টাকাটাই লাভ হিসেবে ধরা পড়ার ঝুঁকি।
টিবিএস একটা উদাহরণ দিয়েছিল। কেউ ২০১০ সালে রিটার্নে ৩০ ভরি দেখিয়েছেন, তখন ভরি প্রায় ৪২ হাজার টাকা। এখন সেই সোনা বেচে ২০ লাখ টাকার আয় দাবি করলে প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ হারে কর দাঁড়াত প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। চূড়ান্ত ৫ শতাংশ হারে একই হিসাবে অঙ্কটা মোটামুটি এক-তৃতীয়াংশ। কম, কিন্তু শূন্য নয়। আর সোনা যদি আদৌ না থাকে, তাহলে সমস্যাটা আর কর হিসাবের থাকে না। রিটার্নে অসত্য তথ্য দেওয়া নিজেই আইনি ঝুঁকি।
বিয়ের, উপহারের বা উত্তরাধিকারের সোনা কীভাবে দেখাবেন?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৭ অনুযায়ী মোট সম্পদ ৫০ লাখ টাকা ছাড়ালে, মোটরগাড়ি থাকলে বা কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পরিসম্পদ ও দায়ের বিবরণী দিতে হয়। স্বামী বা স্ত্রী এবং নাবালক সন্তানের নিজস্ব টিআইএন না থাকলে তাঁদের সম্পদও আপনার বিবরণীতে যায়। এনবিআরের সম্পদ বিবরণী ফরমে সোনা-হীরার ঘরে পরিমাণ উল্লেখ করতে বলা আছে, আর নির্দেশনা হলো সব সম্পদ অর্জন মূল্যে (cost value) দেখাতে হবে, বাজারদরে নয়।
উপহার বা উত্তরাধিকারে পাওয়া সোনার অর্জন মূল্য বিক্রির সময় কীভাবে ধরা হবে, এ নিয়ে চূড়ান্ত আইন বা এনবিআরের কোনো ব্যাখ্যা আমি ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাইনি। তাই এখনই যা করা যায়, তা হলো প্রমাণ গুছিয়ে রাখা:
- আলমারি খুলে গুনুন: আসলে কত ভরি আছে, কোনটা কত ক্যারেটের। রিটার্নের সংখ্যা নয়, দাঁড়িপাল্লার সংখ্যা।
- প্রতিটি গয়নার উৎস লিখুন: কেনা, উপহার না উত্তরাধিকার; কোন সালে; কার কাছ থেকে।
- প্রমাণ খুঁজুন: ক্যাশ মেমো, জুয়েলার্সের রেকর্ড, কাবিননামায় গয়নার উল্লেখ, বিয়ের ছবি, উপহারদাতার লিখিত নোট।
- রিটার্নে পরিমাণ ও মূল্য দুটোই লিখুন: কেনা সোনা কেনার দামে। “অজানা” লেখা বন্ধ করুন।
- আগে বাড়িয়ে দেখানো থাকলে: চুপচাপ পরের বছর কমিয়ে দেবেন না। একজন কর-পেশাজীবীর সঙ্গে বসে সংশোধনের সঠিক পথ ঠিক করুন।
- বিক্রির দিন লিখিত রসিদ নিন: ওজন, ক্যারেট, দর, তারিখ। টাকা নিন ব্যাংক হিসাবে, যাতে বিক্রয়মূল্যের প্রমাণ থাকে।
শেষ কথা: সৎ মানুষের জন্য একটা সহজ পথ দরকার
নতুন নিয়মের উদ্দেশ্য বোঝা যায়। কাগজে সোনা বানিয়ে পরে সেই সোনা “বেচে” অপ্রদর্শিত টাকা বৈধ করার রাস্তা বন্ধ করা। কিন্তু খেসারত দিতে পারেন সেই মানুষও, যাঁর মায়ের ৩৫ বছর আগের গয়নার কোনো রসিদ নেই, কারণ তখন কেউ রসিদ রাখত না।
আমার প্রস্তাব দুটি, দুটিই বাস্তবায়নযোগ্য। এক, এনবিআর বছরভিত্তিক সোনার গড় দরের একটি সরকারি তালিকা প্রকাশ করুক, যা রসিদহীন পুরোনো পারিবারিক সোনার অর্জন মূল্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। দুই, একবারের জন্য একটি সময়সীমা দিক, যার মধ্যে কেউ আগের রিটার্নে বাড়িয়ে দেখানো সোনা জরিমানা ছাড়া কমিয়ে সংশোধন করতে পারবেন। ততদিন আপনার কাজ একটাই: এ বছরের রিটার্ন জমার আগে আলমারি আর রিটার্ন মিলিয়ে দেখুন।
এই লেখা বিনিয়োগ পরামর্শ নয়। সোনা কেনা, রাখা বা বেচার কোনো সুপারিশ এখানে নেই, দামের পূর্বাভাসও নেই।
তথ্যসূত্র
- দ্য ডেইলি স্টার, “Govt fixes flat VAT on gold, diamonds, silver”, ৩০ জুন ২০২৬ — লিংক
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Quarterly VAT, lower gain tax on gold sales in fresh relief package”, ২৯ জুন ২০২৬ — লিংক
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “NBR targets inflated gold declarations with 15% capital gains tax”, ১৪ জুন ২০২৬ — লিংক
- দ্য ডেইলি স্টার, “Capital gains tax on gold, digital currencies from next year”, ১৪ জুন ২০২৬ — লিংক
- প্রথম আলো, “ব্যক্তিগত সোনা বিক্রিতে ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে”, ১৪ জুন ২০২৬ — লিংক
- ঢাকা ট্রিবিউন (বাংলা), “ব্যক্তিশ্রেণির রিটার্নে দেখানো স্বর্ণ বিক্রির মুনাফায় ১৫% কর”, ১৫ জুন ২০২৬ — লিংক
- আয়কর আইন, ২০২৩, রিটার্ন এবং বিবরণী অধ্যায় (ধারা ১৬৭: পরিসম্পদ ও দায়ের বিবরণী), bdlaws.minlaw.gov.bd — লিংক
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পরিসম্পদ, দায় ও ব্যয়ের বিবরণী ফরম (IT-10B, আগের আয়কর অধ্যাদেশের সময়ের নমুনা) — লিংক
- পিডব্লিউসি বাংলাদেশ, অর্থ আইন ২০২৬-এর মূল সংশোধনী — লিংক
- ট্যাক্সপার্ট বিডি, “Bangladesh Tax Changes 2026-27: What You Must Know”, ৮ আগস্ট ২০২৬ — লিংক
হালনাগাদ, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: রাখার মেয়াদ নির্বিশেষে ৫ শতাংশ হার এবং কেনায় ০.৫ শতাংশ উৎসে করের তথ্য যোগ; দুটি সূত্র যোগ।
এই লেখা সাধারণ আইনি ও নীতিগত তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

অ্যাকাউন্ট থাকলে প্রতিবার তথ্য লিখতে হয় না, আর মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। লগইন বা নিবন্ধন করুন