সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: আসল তুলবেন, না মুনাফার আশায় থাকবেন?

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: আসল তুলবেন, না মুনাফার আশায় থাকবেন?

৭ সেপ্টেম্বর থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা পুরো আসল টাকা একবারে তুলতে পারছেন। শর্ত একটাই, এবং সেটা ছোট নয়: আসল তুললে ওই আমানতের মুনাফা মিলবে না। টাকা রেখে দিলে চুক্তির হারে মুনাফা পাওয়ার কথা বলছে ব্যাংক।

তাহলে কী করবেন? উত্তরটা আপনার তিনটি সংখ্যার ওপর নির্ভর করে। সামনের কয়েক মাসে নগদ কত লাগবে। তুললে কত মুনাফা ছাড়তে হবে। আর আপনার আমানতের কতটা আইনি বিমার সীমার বাইরে। এই লেখা বিনিয়োগ পরামর্শ নয়। এটা হিসাব কষার একটা কাঠামো।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর দরজা খুলেছে। কিন্তু দরজার পাশে নোটিশ ঝুলছে: “আসল নিন, মুনাফা রেখে যান।” অনেকের কাছে এটা মুক্তি, কারও কাছে জরিমানা। দুটোই সত্য হতে পারে।

মূল কথা

  • পুরো আসল একবারে তোলা যাচ্ছে, তবে তুললে সেই টাকার মুনাফা বাদ যাবে।
  • আংশিক তুললে বাকি টাকায় মুনাফা চলবে বলে ব্যাংকের বক্তব্য; ঋণ থাকলে আগে সমন্বয়।
  • আমানত সুরক্ষা আইনে বিমার সীমা জনপ্রতি ২ লাখ টাকা, মূলত ব্যাংক বন্ধ বা অবসায়ন হলে।
  • উদ্ধারের খরচ বহন করছে সরকারি কোষাগার, মানে করদাতা।

এখন ঠিক কী নিয়মে টাকা তোলা যাচ্ছে?

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক মিলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। প্রথম আলোর ৩১ আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল-ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাব, মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব এবং মেয়াদি আমানত (এমটিডিআর, ডিপিএস) থেকে সম্পূর্ণ মূল অর্থ এককালীন তোলা বা নগদায়ন করা যাবে। “এ ক্ষেত্রে কোনো মুনাফা পাবেন না তাঁরা।” আবেদন নেওয়া শুরু হয় ১ সেপ্টেম্বর, টাকা দেওয়া ৭ সেপ্টেম্বর থেকে।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে আরও কয়েকটি শর্ত আছে। পুরো আসল তুলে নিলে সেটাই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। আমানতকারীর নিজের ঋণ বকেয়া থাকলে আগে তা কেটে নেওয়া হবে। মেয়াদি আমানত আগেভাগে ভাঙালে সব মুনাফা বাদ। আর আংশিক তুললে বাকি টাকায় মুনাফা চলতে থাকবে।

এর আগে ২৯ জুলাই দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজনে জনপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা তোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, আর মুনাফায় “হেয়ারকাট” স্থগিত করা হয়েছিল। এখনকার ব্যবস্থা সেই সীমা তুলে দিয়েছে, কিন্তু দাম নিচ্ছে মুনাফা দিয়ে।

কত মানুষ টাকা তুলছেন, ব্যাংকের হাতে টাকা আছে তো?

প্রথম আলোর হিসাবে পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা। বাসস জানায়, প্রথম কয়েক দিনে ৭৪ হাজার ২২১টি আবেদনে ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা চাওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। ৭৬১ শাখার এই ব্যাংক প্রথম দুই দিনে ৬৭০ কোটি টাকা পরিশোধ করে।

২১ সেপ্টেম্বর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ২০ দিনে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা তুলতে আবেদন করেছেন। ৯০ হাজার ৯৮ জনকে ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে নতুন আমানত এসেছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ হুড়োহুড়ি যতটা আশঙ্কা ছিল, ততটা হয়নি। ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টাকা তোলার নিয়মে নতুন কোনো পরিবর্তনের খবর পাওয়া যায়নি।

এবার অপ্রিয় অংশ। ডেইলি স্টারের জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, মোট ঋণের ৮৭.৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৮৭ টাকা খেলাপি। ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য ফিরতে তাই সময় লাগবে।

আইন আপনার আমানতের কতটা রক্ষা করে?

১০ এপ্রিল ২০২৬ সংসদে “আমানত সুরক্ষা বিল, ২০২৬” পাস হয়। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমার সীমা ১ লাখ থেকে বেড়ে জনপ্রতি ২ লাখ টাকা। ব্যাংক অবসায়িত হলে অবসায়ক ১০ কার্যদিবসের মধ্যে আমানতকারীর তালিকা দেবেন, তারপর ৭ কার্যদিবসের মধ্যে টাকা পরিশোধের কথা।

খেয়াল করুন, এই সুরক্ষা মূলত ব্যাংক বন্ধ বা অবসায়নের জন্য। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখন চালু ব্যাংক। একীভূত হওয়ার আগের ধাপে আমানত বিমা তহবিল থেকে জনপ্রতি ২ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল। ডেইলি স্টারের হিসাবে ওই কর্মসূচিতে ৮ লাখ ২২ হাজারের বেশি আমানতকারী ৩ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা ফেরত পান। ২ লাখের ওপরের টাকার কোনো আইনি নিশ্চয়তা নেই। সেটা নির্ভর করে ব্যাংকের স্বাস্থ্য আর রাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর।

রাষ্ট্রের সমর্থন মানে করদাতার টাকা। একীভূত ব্যাংকের ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। আপনি এই ব্যাংকের গ্রাহক না হলেও উদ্ধারের বিলে আপনার অংশ আছে।

আরেকটি তথ্য জানা দরকার। ডেইলি স্টারের ১২ এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ সাবেক মালিকদের ব্যাংক ফেরত নেওয়ার পথ খুলেছে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঢালা মূলধনের ৭.৫ শতাংশ আগাম দিতে হবে, বাকি ৯২.৫ শতাংশ দুই বছরে ১০ শতাংশ সরল সুদে। সঙ্গে নতুন মূলধন, সব সহায়তা ফেরত, আমানতকারীর দাবি নিষ্পত্তি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যাচাইয়ের শর্ত। আইনটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত আছে। আমানতকারীর জন্য এর অর্থ সোজা: ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা আবার বদলাতে পারে।

আসল তুলবেন, না রেখে দেবেন: হিসাবটা কীভাবে করবেন?

একটা কাল্পনিক উদাহরণ ধরা যাক। ১০ লাখ টাকার মেয়াদি আমানত। ধরুন বকেয়া মুনাফা ৬০ হাজার টাকা। আজ তুললে হাতে ১০ লাখ, মুনাফা শূন্য। রেখে দিলে কাগজে ১০ লাখ ৬০ হাজার, সঙ্গে সামনের মুনাফা। প্রশ্নটা তাই দাঁড়ায়: ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিমার সীমার বাইরের ৮ লাখ টাকার ঝুঁকি আপনি নেবেন কি না। এর কোনো সর্বজনীন সঠিক উত্তর নেই। অবসরের পুরো সঞ্চয় যাঁর এখানে, আর যাঁর এটা দশটা হিসাবের একটা, তাঁদের উত্তর আলাদা হবেই।

সিদ্ধান্তের আগে এই ধাপগুলো ক্রমানুসারে মিলিয়ে নিন:

  1. নগদের প্রয়োজন লিখুন: চিকিৎসা, সন্তানের ভর্তি, ঋণ শোধ। সামনের ৬ থেকে ১২ মাসে কত লাগবে।
  2. শাখা থেকে লিখিত হিসাব নিন: আজ তুললে ঠিক কত মুনাফা বাদ যাবে। মুখের কথায় নয়, কাগজে।
  3. ঋণ আছে কি না দেখুন: থাকলে সমন্বয়ের পর হাতে কত আসবে।
  4. আংশিক উত্তোলন বিবেচনা করুন: প্রয়োজনের টাকাটুকু তুলে বাকিটায় মুনাফা চালু রাখা যায় কি না, শাখায় লিখিতভাবে নিশ্চিত হোন।
  5. বিমার সীমার বাইরের অঙ্কটা আলাদা করে দেখুন: ২ লাখের ওপরে কত আছে, সেটাই আপনার অরক্ষিত অংশ।
  6. পরিবারে কথা বলুন: নমিনি হালনাগাদ আছে কি না, এটাও এই সুযোগে দেখে নিন।

কী কাগজ লাগবে, আর কাদের থেকে সাবধান থাকবেন?

প্রথম আলোর ৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রক্রিয়াটা হলো শাখায় আবেদন, তারপর শাখা যোগাযোগ করে টাকা দেয়। অনলাইন স্থানান্তরও চালু। সঙ্গে সাধারণত যা রাখবেন: জাতীয় পরিচয়পত্র, চেকবই বা পাসবই, মেয়াদি আমানতের রসিদ। আমানতকারী মারা গিয়ে থাকলে নমিনি বা উত্তরাধিকারের কাগজ। কোন কাগজ বাধ্যতামূলক, তা আপনার শাখা থেকে লিখিত তালিকা নিয়ে নিন।

যেখানে লাইন আর অনিশ্চয়তা, সেখানে “ভাই, আমি ভেতরে লোক চিনি” মার্কা মানুষও আসে। নিয়মগুলো মনে রাখুন:

  • আবেদনের জন্য কোনো ফি বা “স্পিড মানি” লাগে না। কেউ কমিশনের বিনিময়ে দ্রুত টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলে প্রত্যাখ্যান করুন।
  • ওটিপি, পিন, সই করা খালি চেক কাউকে দেবেন না, “ব্যাংকের লোক” পরিচয় দিলেও না।
  • ফোনে বা ফেসবুকে আসা “আবেদন লিংক” এড়িয়ে চলুন। আবেদন নিজের শাখায়, নিজে গিয়ে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতারণা হলে প্রথম এক ঘণ্টায় কী করবেন, তা নিয়ে আলাদা লেখা আছে।
  • হয়রানি হলে শাখা ব্যবস্থাপককে লিখিত জানান। সমাধান না হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রের হটলাইন ১৬২৩৬-এ (অফিস সময়ে) বা অনলাইন ফরমে অভিযোগ করা যায়।

শেষ কথা: সিদ্ধান্ত আপনার, হিসাবটা ব্যাংকের দেওয়া উচিত

এই সংকট আমানতকারীরা তৈরি করেননি, অথচ সবচেয়ে কঠিন অঙ্কটা কষতে হচ্ছে সেই মানুষটিকেই, যিনি শুধু টাকা জমা রেখেছিলেন।

আমার প্রস্তাব একটাই এবং বাস্তবায়নযোগ্য। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দিক, প্রতিটি আবেদনকারীকে আবেদন জমার সময়ই এক পাতার লিখিত “মুনাফা-ত্যাগ বিবরণী” দিতে হবে: আজ তুললে কত পাবেন, কত মুনাফা বাদ যাবে, আংশিক তুললে কী হবে, ঋণ সমন্বয়ে কত কাটবে। তথ্য হাতে থাকলে মানুষ ভয়ে নয়, হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেয়। আর ততদিন নিজের জন্য একটা কাজ করুন: কাউন্টারে যাওয়ার আগে ওপরের ছয়টি ধাপ কাগজে লিখে নিন।

আবারও বলি, এটি বিনিয়োগ পরামর্শ নয়। টাকা রাখা বা তোলার কোনো সুপারিশ এখানে করা হয়নি; সিদ্ধান্ত আপনার নিজের প্রয়োজন ও ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্যের ওপর।

তথ্যসূত্র

  1. প্রথম আলো, “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা ৭ সেপ্টেম্বর থেকে টাকা পাবেন”, ৩১ আগস্ট ২০২৬ — লিংক
  2. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “18,000 customers seek Tk1,300cr from Sammilito Islami Bank”, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
  3. দ্য ডেইলি স্টার, “Depositors of five merging banks can now withdraw up to Tk 10 lakh”, ২৯ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  4. বাসস, “Sammilito Islami Bank disburses Tk 670cr to depositors in 2 days”, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
  5. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Sammilito Islami Bank customers apply to withdraw Tk6,975cr in 20 days; Tk3,245cr disbursed so far”, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
  6. বাসস, “জাতীয় সংসদে ‘আমানত সুরক্ষা বিল, ২০২৬’ পাস”, ১০ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক
  7. দ্য ডেইলি স্টার, “Bank Resolution Act, 2026: Doors open for ex-owners to reclaim banks”, ১২ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক
  8. বাংলাদেশ ব্যাংক, গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্র (CIPC): অভিযোগ দাখিলের পদ্ধতি — লিংক

হালনাগাদ, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: টাকা তোলার নিয়মের সর্বশেষ অবস্থা যোগ; একটি একপক্ষীয় উদ্ধৃতি ও কয়েকটি বিদ্রূপাত্মক বাক্য বাদ; প্রতারণা-বিষয়ক লেখার লিংক যোগ।

এই লেখা সাধারণ আইনি ও নীতিগত তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।