দেউলিয়া আইন আছে, ব্যবহার প্রায় নেই: খেলাপি ঋণের ৬ লাখ কোটির দেশে কেন দরকার উদ্ধারের পথ
একটা কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনশো শ্রমিকের বেতন বাকি, ছয়জন সরবরাহকারীর পাওনা আছে, দুটি ব্যাংকের ঋণ আছে। এখন কী হবে? বাংলাদেশে সাধারণ উত্তর হলো: প্রত্যেকে আলাদা মামলা করবেন, আলাদা আদালতে, আলাদা গতিতে। মেশিন পড়ে থেকে নষ্ট হবে, শ্রমিক প্রায় কিছুই পাবেন না, আর ব্যাংক শেষমেশ পাবে ঋণের সামান্য অংশ।
অথচ ঠিক এই পরিস্থিতির জন্যই একটা আইন আছে: দেউলিয়া বিষয়ক আইন, ১৯৯৭। সমস্যা হলো, আইনটা প্রায় কেউ ব্যবহার করে না।
মূল কথা
- দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের হিসাবে ১৯৯৭ থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত দেউলিয়া আইনে মামলা হয়েছে ৫৩৩টি; ২৬ বছরে আদায় মাত্র ৪১৬ কোটি টাকা।
- জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের এককালীন এক্সিট সুবিধা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত; পুরো বকেয়া একবারে দিলে সুদ মওকুফের সুযোগ আছে।
- বিপদে পড়া ব্যবসায়ীর জন্য সবচেয়ে বড় ভুল হলো চুপ করে থাকা; শুরুতেই ব্যাংকের সঙ্গে লিখিত আলোচনা সবচেয়ে সস্তা পথ।
সংখ্যাগুলো পাশাপাশি
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ৮ অক্টোবর ২০২৩-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৭ থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত দেউলিয়া আইনে মামলা হয়েছে ৫৩৩টি। এর মধ্যে ৩৬১টি নিষ্পত্তি হয়েছে, বিচারাধীন ১৭২টি। ২৬ বছরে দাবি করা হয়েছিল প্রায় ২,৭৫৭ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৪১৬ কোটি। (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে সংখ্যাটা প্রায় ৬৩৮; হিসাবের উৎসভেদে পার্থক্য আছে, তবে ছবি একই।)
অন্যদিকে জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়, বিতরণ করা ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। এর একটা অংশ অবশ্য হিসাবের নিয়ম বদলের ফল: এপ্রিল ২০২৫ থেকে তিন মাস কিস্তি বকেয়া থাকলেই ঋণ খেলাপি ধরা হয়, আগে লাগত ছয় মাস।
দুটো সংখ্যা পাশাপাশি রাখলে প্রশ্নটা নিজেই দাঁড়িয়ে যায়। এত টাকা আটকে আছে, অথচ অসচ্ছল প্রতিষ্ঠানের ভাগ্য ঠিক করার জন্য তৈরি আইনটা বছরে গড়ে কুড়িবারও ব্যবহার হয় না।
আদায় আর উদ্ধার এক জিনিস নয়
পার্থক্যটা সহজ। আদায় মানে পাওনাদার নিজের টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছেন: জামানত বিক্রি করে, মামলা করে, চাপ দিয়ে। উদ্ধার মানে প্রতিষ্ঠানটা নিয়ে সিদ্ধান্ত: চালু রাখা যায় কি না, ঋণ পুনর্গঠন করা যায় কি না, নাকি গুছিয়ে বন্ধ করে সম্পদ সবার মধ্যে ন্যায্যভাবে ভাগ করাই ভালো।
বাংলাদেশে আদায়ের যন্ত্র আছে: অর্থ ঋণ আদালত, জামানত বিক্রির বিধান। দুর্বল ব্যাংক সামলাতে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৮৮ নং আইন) এসেছে। খারাপ ঋণ কিনে নেওয়ার জন্য বেসরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির একটা খসড়া আইনও আলোচনায় আছে, যদিও তা এখনো পাস হয়নি। কিন্তু একটা বন্ধ কারখানার সব পাওনাদারকে এক টেবিলে বসিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কার্যকর পথ কার্যত নেই।
দেউলিয়া আইন কেন কাজ করে না
আইনের ৪ ধারায় জেলা জজ আদালতই দেউলিয়া আদালত; জেলা জজ চাইলে অতিরিক্ত জেলা জজকে দায়িত্ব দিতে পারেন। আলাদা কোনো বিশেষায়িত আদালত নেই, প্রশিক্ষিত পেশাদার অবসায়ক বা প্রশাসকের কাঠামোও দুর্বল। মামলা চলে দেওয়ানি গতিতে, অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে আটকে থাকে। আর সামাজিকভাবে “দেউলিয়া” শব্দটাই এমন কলঙ্ক, যে কোনো ব্যবসায়ী নিজে থেকে এই পথে যেতে চান না।
ফলে সবাই আলাদা পথে দৌড়ান। যে পাওনাদার আগে জামানত হাতে পান, তিনি কিছু পান; বাকিরা, বিশেষ করে শ্রমিক আর ছোট সরবরাহকারী, প্রায়ই খালি হাতে ফেরেন।
পাল্টা যুক্তিটা শক্ত
সবচেয়ে জোরালো আপত্তি এই: এত বড় খেলাপি ঋণ কোনো আইনি ফাঁকের ফল নয়; অনেক ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্তটাই ভুল ছিল। আধুনিক দেউলিয়া আইন থাকলেও সেসব ঋণ ঠেকানো যেত না।
কথাটা সত্য। দেউলিয়া আইন ঋণ কেলেঙ্কারি ঠেকায় না। কিন্তু দাবিটা সেটা নয়। দাবিটা সংকীর্ণ: কারণ যা-ই হোক, ঋণের পেছনে যে চালু বা বন্ধ কোম্পানিগুলো আছে, সেগুলোর দ্রুত ও ন্যায্য নিষ্পত্তির ব্যবস্থা দরকার। কেলেঙ্কারি ঠেকানো আর ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করা দুটো আলাদা কাজ, আর দ্বিতীয়টার জন্য যন্ত্র লাগে।
ছোট একটা শুরু
ভারতের ধাঁচে পূর্ণাঙ্গ কোড রাতারাতি বসানো কঠিন। বরং সীমিত শুরু করা যায়, বিদ্যমান আদালত কাঠামোর মধ্যেই:
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য সরলীকৃত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া: সব পাওনাদার এক জায়গায়, নির্দিষ্ট সময়সীমা, আর পরিকল্পনা মেনে নেওয়া হলে বাকি মামলা স্থগিত।
- প্রক্রিয়া চলার সময় সাময়িক স্থগিতাদেশ, যাতে একজন পাওনাদার জামানত তুলে নিয়ে বাকিদের খালি হাতে ফেলতে না পারেন।
- পুনর্গঠন ব্যর্থ হলে দ্রুত অবসায়ন, আর বণ্টনে শ্রমিকের বকেয়ার অগ্রাধিকার স্পষ্ট করা।
আপনার ব্যবসা বিপদে পড়লে যা করবেন
- কিস্তি আটকানোর আগেই ব্যাংককে লিখিতভাবে জানান। নগদ প্রবাহের হিসাব আর একটা বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে যান; নীরবতা ব্যাংককে মামলার দিকেই ঠেলে দেয়।
- বাংলাদেশ ব্যাংক ২৯ জুন ২০২৬ এককালীন এক্সিট সুবিধা দিয়েছে। ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত ঋণ, আর ৬ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে পুনঃতফসিল হওয়া ঋণ এর আওতায়; পুরো বকেয়া একবারে দিলে পর্ষদের অনুমোদনে সুদ মওকুফ হতে পারে। সময় ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত।
- শ্রমিকের বেতন আর আইনি পাওনা আলাদা করে হিসাব রাখুন। ব্যবসা বন্ধ হলেও এই দায় সবার আগে আসে।
- একাধিক পাওনাদার থাকলে সবার সঙ্গে একসঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করুন; একজনকে শোধ করে বাকিদের ফেলে রাখলে পরে জটিলতা বাড়ে।
- দেউলিয়া আবেদন, পুনঃতফসিল বা আপস, কোনটা আপনার জন্য ঠিক, তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন আইনজীবী ও হিসাববিদের সঙ্গে বসুন।
শেষ কথা
রাষ্ট্র এখন খেলাপি ঋণ সমস্যার দিকে তাকিয়ে আছে: এক্সিট সুবিধা, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির খসড়া। কিন্তু প্রায় সব হাতিয়ারই পাওনাদারের দিকের। বিপদে পড়া কোম্পানিকে গুছিয়ে উদ্ধার বা বন্ধ করার দিকটা এখনো ফাঁকা। জামানতের দাম নিয়ে হাইকোর্টে আটকে থাকা মামলার কথা পড়ুন: জামানতের দাম কে ঠিক করবে?
তথ্যসূত্র
- দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, “Bankruptcy cases yield little for banks”, ৮ অক্টোবর ২০২৩ — লিংক
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Cases drag at bankruptcy courts”, ৫ জুন ২০২১ — লিংক
- ঢাকা ট্রিবিউন, “Default loans in banking sector cross Tk6 lakh crore”, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Loan defaulters now offered one-time lump-sum exit”, ২৯ জুন ২০২৬ — লিংক
- দ্য ডেইলি স্টার, “Private firms to buy bad loans, take over companies”, ২৬ জুন ২০২৬ — লিংক
- লজ অব বাংলাদেশ, দেউলিয়া বিষয়ক আইন, ১৯৯৭ — লিংক
- লজ অব বাংলাদেশ, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ — লিংক
এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য ও মতামত, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। পরিসংখ্যান প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে নেওয়া; নিজের ব্যবসার সিদ্ধান্তের আগে পেশাদার পরামর্শ নিন।

অ্যাকাউন্ট থাকলে প্রতিবার তথ্য লিখতে হয় না, আর মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। লগইন বা নিবন্ধন করুন