মূল্যস্ফীতি কমছে — তাহলে বাজারে টের পাই না কেন?

মূল্যস্ফীতি কমছে — তাহলে বাজারে টের পাই না কেন?

মূল্যস্ফীতি কমছে মানে দাম কমছে না। মানে দাম আগের চেয়ে একটু ধীরে বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে আগস্ট ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ৮.২৬ শতাংশ। সহজ ভাষায়, গত আগস্টে যে জিনিসের দাম ১০০ টাকা ছিল, এখন তার গড় দাম ১০৮ টাকা ২৬ পয়সা। জুলাইয়ে হারটা ছিল ৮.৩২ শতাংশ। কমেছে ০.০৬ শতাংশ বিন্দু। বাজারের থলেতে সেটা টের পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

ব্যাপারটা গাড়ির স্পিডোমিটারের মতো। গাড়ি ঘণ্টায় ৮৩ কিলোমিটার থেকে ৮২-তে নামলে যাত্রী পেছনে ফিরে আসে না, সামনেই যায়, শুধু একটু আস্তে। মূল্যস্ফীতির হার হলো স্পিডোমিটার। আপনার পকেট দেখে ওডোমিটার, মানে এ পর্যন্ত মোট কতটা পথ দাম পেরিয়ে এসেছে।

এর সঙ্গে আরও দুটো সত্য আছে, যেগুলো শিরোনামে আসে না। কমছে মূলত খাদ্যের মূল্যস্ফীতি, খাদ্যবহির্ভূত খরচ উল্টো বাড়ছে। আর মজুরি এখনো দামের পেছনে হাঁটছে।

মূল কথা

  • আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৮.২৬%, অর্থাৎ দাম এক বছরে গড়ে ৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
  • খাদ্যে ৭.০২%, কিন্তু খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯.৩২%, আর এটা বাড়ছে।
  • মজুরি বেড়েছে ৮.০৫%, এখনো মূল্যস্ফীতির নিচে।
  • সেপ্টেম্বরে জ্বালানির দাম বাড়ায় সামনে চাপ আবার বাড়তে পারে।

মূল্যস্ফীতি কমছে মানে আসলে কী?

বিবিএস যে সংখ্যাটা প্রতি মাসে দেয়, তার নাম পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট (point-to-point) মূল্যস্ফীতি। এটা এ বছরের একটি মাসের দামের গড়কে গত বছরের একই মাসের সঙ্গে তুলনা করে। তাই আগস্টের ৮.২৬ শতাংশ বলে, ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় দাম কত বেড়েছে। কত কমেছে, সেটা বলে না, কারণ কমেনি।

ওডোমিটারের হিসাবটা চক্রবৃদ্ধিতে চলে। একটা কাল্পনিক উদাহরণ নিই। কোনো পরিবারের মাসিক বাজার-ঝুড়ির দাম ছিল ২০ হাজার টাকা। টানা তিন বছর ৯ শতাংশ করে দাম বাড়লে সেই ঝুড়ির দাম দাঁড়ায় প্রায় ২৫ হাজার ৯০০ টাকা। চতুর্থ বছরে হার ৮ শতাংশে নামলে সংবাদ শিরোনাম হবে “মূল্যস্ফীতি কমেছে”। ঝুড়ির দাম তখন প্রায় ২৮ হাজার টাকা।

বাস্তবের সংখ্যাও এর কাছাকাছি গল্প বলে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি উঠেছিল ১১.৬৬ শতাংশে, খাদ্যে ১৪.১০ শতাংশ। সেখান থেকে এখন ৮ শতাংশের ঘরে নেমেছে, এটা সত্যিকারের অগ্রগতি। কিন্তু সেই ১১.৬৬ শতাংশে যে দাম উঠেছিল, তার ওপরেই এখনকার ৮.২৬ শতাংশ বসেছে। দাম নামেনি, শুধু ওঠার গতি কমেছে।

চালের চেয়ে বাসাভাড়া আর যাতায়াতে বেশি লাগে কেন?

কারণ সংখ্যাও তা-ই বলছে। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.০২ শতাংশ, জুলাইয়ে ছিল ৭.১৬। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৩২ শতাংশ, জুলাইয়ে ছিল ৯.২৮, আর এক বছর আগে ৮.৯০। মানে মোট হার যে সামান্য কমেছে, সেটা খাদ্যের কল্যাণে। বাকি খরচ উল্টো দিকে হাঁটছে। গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আরও বেশি, ৯.৫৯ শতাংশ; শহরে ৮.৯৭।

খাদ্যবহির্ভূত মানে বাসাভাড়া, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাস, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো খরচ। বিবিএসের এক কর্মকর্তা ডেইলি স্টারকে আগেই জানিয়েছিলেন, বাসাভাড়া এই খাদ্যবহির্ভূত ভাগেই ধরা হয়। এ বছর এই ভাগে সরকারি সিদ্ধান্তের চাপও কম আসেনি। জুনে খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৭ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এপ্রিলে, জুনে, আবার সেপ্টেম্বরে।

মধ্যবিত্ত কেন বেশি টের পান, সেটা এখানেই। তাঁদের মাসের বাজেটে চালের চেয়ে বাসাভাড়া, স্কুলের বেতন, অফিসে যাওয়ার ভাড়া আর বিদ্যুৎ বিলের ভাগ বড়। এগুলোর বেশির ভাগে দরদাম চলে না, অন্য দোকানে যাওয়ার সুযোগও কম। চালের দাম বাড়লে কম দামি চাল কেনা যায়। বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়ালে কম দামি মাস কেনা যায় না।

বেতন বাড়লেও মাস শেষে টান পড়ে কেন?

কারণ বেতন দামের সমান গতিতে বাড়েনি। বিবিএসের মজুরি হার সূচক আগস্টে বেড়েছে ৮.০৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ৮.২৬। জুলাইয়ে মজুরি ৮.২২, মূল্যস্ফীতি ৮.৩২। ডেইলি স্টার এপ্রিলে জানিয়েছিল, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত টানা ৫০ মাস মূল্যস্ফীতি মজুরিকে ছাড়িয়ে গেছে। জুলাই-আগস্টের সংখ্যাও বলছে, জাতীয় পর্যায়ে ব্যবধান এখনো বন্ধ হয়নি।

ন্যায্যতার জন্য একটা ভালো খবরও বলা দরকার। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী জুলাইয়ে ঢাকা বিভাগে মজুরি বেড়েছে ৮.৭২ শতাংশ, যা শহরের মূল্যস্ফীতির (৮.২৪) চেয়ে বেশি। তবে মনে রাখুন, এই সূচক মূলত কম মজুরির শ্রমজীবী মানুষের মজুরি ধরে। যে চাকরিজীবীর বেতন বছরে একবার বাড়ে, বা এ বছর বাড়েইনি, তাঁর গল্প এই সূচকে নেই। তাঁর জন্য হিসাব সোজা: বেতন ৫ শতাংশ বাড়লে আর দাম ৮ শতাংশ বাড়লে প্রকৃত আয় কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ।

জ্বালানির দাম বাড়ায় সামনে কী হতে পারে?

২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে। বাসভাড়া আর পণ্য পরিবহনে এর হিসাব আলাদা লেখায় করেছি। মূল্যস্ফীতির প্রশ্নে অর্থনীতিবিদদের সুর মোটামুটি এক। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ ডেইলি স্টারকে বলেছেন, গত দুই মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমছিল, এই সিদ্ধান্ত নতুন চাপ তৈরি করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীন ইসলামের মতে, বেতন সমন্বয় না হলে বেসরকারি খাতের কর্মীদের প্রকৃত আয় কমবে। সরকারের বক্তব্য, ভর্তুকির চাপে বিকল্প ছিল না।

কত শতাংশ বিন্দু বাড়বে, সেই হিসাব ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোনো সরকারি সূত্রে প্রকাশ হতে দেখিনি। অনুমান না করে এটুকু বলা যায়: খাদ্যবহির্ভূত খাত আগে থেকেই বাড়ছিল, আর জ্বালানি সরাসরি সেই খাতেই আঘাত করে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের সংখ্যা আসার আগে আগস্টের সামান্য পতন নিয়ে উৎসব করার সময় এখনো আসেনি।

তাহলে দাম কবে কমবে?

এই প্রশ্নের সৎ উত্তরটা অস্বস্তিকর: সম্ভবত কখনো না, অন্তত সব জিনিসের একসঙ্গে নয়। মৌসুমে সবজি বা পেঁয়াজের দাম পড়ে, আবার ওঠে। কিন্তু সামগ্রিক দামস্তর নিচে নামা, অর্থনীতির ভাষায় মূল্য সংকোচন (deflation), খুব বিরল ঘটনা। আর যখন ঘটে, সাধারণত মন্দার সঙ্গে আসে, যখন চাকরি আর বিক্রি দুটোই কমে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাই সাধারণত দাম কমানো নয়, দাম বাড়ার গতি কমানোকেই লক্ষ্য ধরে।

তাহলে স্বস্তি আসবে কোন পথে? একটাই পথ: আয় যেন দামের চেয়ে দ্রুত বাড়ে, আর সেটা কয়েক বছর ধরে চলে। মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামল আর বেতন বাড়ল ৯ শতাংশ, এমন কয়েকটা বছর গেলে তবেই মানুষ বলবে “বাজার একটু সহনীয় লাগছে”। তার আগে মূল্যস্ফীতি কমার খবর আসলে এই বার্তা দেয় যে ক্ষত বাড়ার গতি কমেছে। ক্ষত সারতে শুরু করেছে, এমন নয়। তাই সরকারি সংখ্যা আর বাজারের অনুভূতির মধ্যে যে দূরত্ব, সেটা কারও ভুল বোঝা নয়। দুটো আলাদা প্রশ্নের দুটো সঠিক উত্তর।

সংসারের বাজেটে এখন কী করা যায়?

জাতীয় গড় আপনার গড় নয়। নিজের মূল্যস্ফীতি নিজে মাপলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। ধাপগুলো এমন:

  1. গত বছরের এই মাসের খরচ বের করুন। ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের স্টেটমেন্টেই বেশির ভাগ পাওয়া যায়। এ মাসের সঙ্গে তুলনা করুন। এটাই আপনার ব্যক্তিগত মূল্যস্ফীতি।
  2. খরচকে তিন ভাগে ভাগ করুন: স্থির (ভাড়া, স্কুল ফি, বিল), যাতায়াত, আর বাজার। কাটছাঁটের সুযোগ মূলত শেষ দুটিতে।
  3. যাতায়াতের সাপ্তাহিক হিসাব রাখুন। বাসভাড়া সরকারি হারের বেশি চাইলে সেটা আইনত অভিযোগযোগ্য, ভোক্তা অধিকারের হটলাইন ১৬১২১।
  4. বাসাভাড়া দিলে রসিদ নিন। বাড়ী ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর ধারা ১৩ ভাড়া আদায়ের রসিদ দেওয়ার বিধান রেখেছে। রসিদ থাকলে ভাড়া বাড়ানো নিয়ে দর-কষাকষিতে কাগজ আপনার পক্ষে থাকে।
  5. বেতন আলোচনায় সরকারি সংখ্যা ব্যবহার করুন। “বেতন ৫ শতাংশ বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ৮.২৬” কথাটা আবেগ নয়, বিবিএসের হিসাব।
  6. নিয়মিত সংসার খরচ চড়া সুদের ধারে চালাবেন না। মূল্যস্ফীতির ওপর সুদ যোগ হলে মাসের ঘাটতি পরের মাসে দ্বিগুণ হয়ে ফেরে।

রাষ্ট্র কী প্রকাশ করলে ছবিটা পরিষ্কার হতো?

বিবিএস এখন শহর-গ্রাম আর বিভাগভিত্তিক মূল্যস্ফীতি দেয়, মজুরি সূচক দেয়, ত্রৈমাসিক বাসাভাড়া সূচকও প্রকাশ করেছে। এগুলো আছে বলেই এই লেখা লেখা গেল। কিন্তু ঢাকার একজন ভাড়াটের প্রশ্ন, “আমার এলাকায় ভাড়া কত বাড়ল”, তার উত্তর এসব সংখ্যায় মেলে না। জাতীয় গড়ে মিরপুর আর মেহেরপুর একসঙ্গে গলে যায়।

আমার প্রস্তাব নির্দিষ্ট। এক, ঢাকা ও চট্টগ্রামের জন্য আলাদা মাসিক সিটি সিপিআই (city CPI) আর শহরভিত্তিক বাসাভাড়া সূচক প্রকাশ হোক। দুই, সিপিআই-এর পণ্যঝুড়ি, প্রতিটি পণ্যের ওজন আর মাসিক গড় দাম খোলা ডেটা হিসেবে বিবিএসের ওয়েবসাইটে থাকুক, যাতে যে কেউ নিজের পরিবারের হিসাব মিলিয়ে দেখতে পারেন। তিন, সরকার যখন বিদ্যুৎ বা জ্বালানির দাম বদলায়, প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে মূল্যস্ফীতিতে আনুমানিক প্রভাবের একটি সংখ্যা দিক। তখন স্পিডোমিটারের পাশে ওডোমিটারটাও মানুষের চোখে পড়বে, আর “মূল্যস্ফীতি কমেছে” শুনে কাউকে বাজারের থলে হাতে বিভ্রান্ত হতে হবে না।

তথ্যসূত্র

  1. বাসস, “Inflation eases slightly to 8.26pc in August”, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
  2. বাসস, “Dhaka wages outpace inflation as price pressures ease”, ২৩ আগস্ট ২০২৬ — লিংক
  3. দ্য ডেইলি স্টার, “Inflation outpaces wages for 50 months”, ১৩ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক
  4. প্রথম আলো (ইংরেজি), “Inflation rises to 11.66pc in July”, ১২ আগস্ট ২০২৪ — লিংক
  5. দ্য ডেইলি স্টার, “Fuel price hike may prolong inflationary pressure: economists”, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
  6. দ্য ডেইলি স্টার, “Power prices up 16.7% on average”, ৪ জুন ২০২৬ — লিংক
  7. দ্য ডেইলি স্টার, “House rent on the rise: BBS”, ১১ অক্টোবর ২০২৩ — লিংক
  8. বাড়ী ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১, ধারা ১৩, বাংলাদেশ আইনের সংকলন (bdlaws) — লিংক

হালনাগাদ, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬: সম্পর্কিত লেখার লিংক যোগ; তথ্য পুনরায় যাচাই।

এই লেখা সাধারণ আইনি ও নীতিগত তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।