শ্রম আইন: মালিক ও শ্রমিক — দুজনেরই যেটা জানা দরকার

চাকরি গেলে বা ছেড়ে দিলে কী পাবেন: শ্রম আইনের সহজ হিসাব (২০২৬ সংশোধনীসহ)

চাকরি শেষ হওয়ার মুহূর্তটা বেশির ভাগ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তার। শ্রমিক জানেন না তিনি কী পাবেন; মালিক জানেন না কত দিতে হবে, আর কী না দিলে পরে মামলা হবে। দুই পক্ষের এই অজানা থেকেই শ্রম আদালতের বেশির ভাগ বিরোধ জন্ম নেয়।

এই লেখা ইচ্ছা করেই দুই পক্ষের জন্য। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর যে ধারাগুলো চাকরি শেষ হওয়া আর পাওনা নিয়ে, সেগুলো ২০২৬ সালের সংশোধনীসহ সহজ ভাষায় সাজানো হলো। সংশোধনীর সামগ্রিক আলোচনা আলাদা লেখায় আছে: শ্রম আইন ২০২৬: শ্রমিক আর মালিকের জন্য কী কী বদলাল।

মূল কথা

  • যে কারণেই চাকরি শেষ হোক, সব পাওনা ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে (ধারা ৩০)।
  • ২০২৬ সংশোধনীতে ইস্তফায় ক্ষতিপূরণ বদলেছে: ৩ বছর পর্যন্ত চাকরিতে প্রতি বছরে ৭ দিনের, ৩–১০ বছরে ১৫ দিনের, ১০ বছর বা বেশি হলে ৩০ দিনের মজুরি বা গ্র্যাচুইটি, যেটা বেশি।
  • মালিক শাস্তি ছাড়া চাকরির অবসান করলে স্থায়ী মাসিক শ্রমিককে ১২০ দিনের নোটিশ বা তার মজুরি, আর প্রতি বছরে ৩০ দিনের মজুরি বা গ্র্যাচুইটি, যেটা বেশি (ধারা ২৬)।
  • অভিযোগ থাকলে ৩০ দিনের মধ্যে মালিককে লিখিত অভিযোগ, তারপর শ্রম আদালত; শ্রম পরিদর্শন অধিদপ্তরের টোল-ফ্রি হেল্পলাইন ১৬৩৫৭।

আগে জেনে নিন: আপনি কি “শ্রমিক”?

২০২৬ সালের সংশোধনীর পর শিক্ষানবিশ আর ঠিকাদারের মাধ্যমে নিযুক্ত কর্মীরাও স্পষ্টভাবে শ্রমিকের সংজ্ঞায় এসেছেন। বাদ পড়েছেন শুধু তাঁরা, যাঁদের লিখিতভাবে ব্যবস্থাপনা, প্রধান নির্বাহী, ব্যবস্থাপক, প্রশাসনিক বা তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই নিয়োগপত্রে আপনার পদ আর দায়িত্ব কীভাবে লেখা, সেটা দেখে নিন; এই লেখার অধিকারগুলো মূলত শ্রমিকের জন্য।

এক নজরে: কোন ক্ষেত্রে কী পাবেন

পরিস্থিতিনোটিশক্ষতিপূরণ (প্রতি পূর্ণ বছর চাকরির জন্য)
ইস্তফা, স্থায়ী শ্রমিক (ধারা ২৭)শ্রমিক দেবেন ৬০ দিনের নোটিশ, বা সেই সময়ের মজুরি৩ বছর পর্যন্ত: ৭ দিনের মজুরি; ৩–১০ বছর: ১৫ দিনের; ১০ বছর বা বেশি: ৩০ দিনের মজুরি বা গ্র্যাচুইটি, যেটা বেশি
মালিকের অবসান, শাস্তি হিসেবে নয় (ধারা ২৬)স্থায়ী মাসিক: ১২০ দিন; অন্য স্থায়ী: ৬০ দিন; বা সেই সময়ের মজুরি৩০ দিনের মজুরি বা গ্র্যাচুইটি, যেটা বেশি
ছাঁটাই (ধারা ২০), অন্তত ১ বছর চাকরি১ মাসের লিখিত নোটিশ, বা মজুরি৩০ দিনের মজুরি বা গ্র্যাচুইটি, যেটা বেশি
অসুস্থতা বা অক্ষমতার কারণে ডিসচার্জ (ধারা ২২), অন্তত ১ বছর চাকরিপ্রযোজ্য নয় (চিকিৎসকের প্রত্যয়ন লাগে)৩০ দিনের মজুরি বা গ্র্যাচুইটি, যেটা বেশি
অসদাচরণে বরখাস্ত বা অপসারণ (ধারা ২৩), অন্তত ১ বছর চাকরিনোটিশ নেই১৫ দিনের মজুরি; তবে চুরি, আত্মসাৎ, প্রতারণা বা ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের মতো অসদাচরণে কিছুই নয়

অস্থায়ী শ্রমিকের নোটিশ কম: মাসিক মজুরির ক্ষেত্রে ৩০ দিন, অন্যদের ১৪ দিন। আর ২০২৬ সংশোধনীর পর অসদাচরণে বরখাস্ত শ্রমিকের ১৫ দিনের মজুরির বিধানটি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ; আইনের ভাষা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তাই নিজের ক্ষেত্রে পরামর্শ নিন।

২০২৬ সালে যা বদলেছে

  • ইস্তফার ক্ষতিপূরণ: আগে ৫ বছরের কম চাকরিতে কিছুই মিলত না। এখন প্রথম বছর পূর্ণ হলেই প্রতি বছরে ৭ দিনের মজুরি পাওয়া যায়।
  • লে-অফ: ক্ষতিপূরণ পেতে এখন অন্তত ৩ মাসের চাকরিই যথেষ্ট, আগে লাগত ১ বছর। প্রতি লে-অফ দিনের জন্য মূল মজুরি ও মহার্ঘ ভাতার অর্ধেক আর পুরো বাড়িভাড়া ভাতা; বছরে ৪৫ দিনের পরের সময়ের জন্যও একই হারে, আগে যেখানে হার ছিল এক-চতুর্থাংশ।
  • বকেয়া মজুরির দাবি: এখন শ্রম পরিদর্শকও শ্রমিকের পক্ষে দাবি দাখিল করতে পারেন (ধারা ১৩২)।

পাওনা কী কী হতে পারে

  • শেষ মাসের বকেয়া মজুরি ও ওভারটাইম।
  • অর্জিত ছুটির (ভোগ না করা ছুটির) নগদায়ন।
  • নোটিশের বদলে মজুরি, যদি নোটিশ দেওয়া না হয়ে থাকে।
  • উপরের সারণির ক্ষতিপূরণ।
  • প্রতিষ্ঠানে গ্র্যাচুইটি স্কিম থাকলে গ্র্যাচুইটি: প্রতি পূর্ণ বছরে (ছয় মাসের বেশি হলে বছর ধরা হয়) অন্তত ৩০ দিনের মজুরি, ১০ বছরের বেশি চাকরিতে ৪৫ দিনের।
  • ভবিষ্য তহবিলে নিজের ও মালিকের চাঁদা, তহবিলের নিয়ম অনুযায়ী।

মালিকেরা যেসব ভুল করেন

  1. মুখে মুখে চাকরি শেষ করে দেওয়া। লিখিত আদেশ আর কারণ না থাকলে পরে আদালতে মালিকের অবস্থান দুর্বল হয়।
  2. অসদাচরণের অভিযোগে বরখাস্ত করার আগে ধারা ২৪-এর পদ্ধতি না মানা: লিখিত অভিযোগ, জবাবের জন্য অন্তত ৭ দিন, শুনানি, আর তদন্ত। পদ্ধতির ত্রুটিতেই বহু বরখাস্ত আদালতে বাতিল হয়।
  3. ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে পাওনা না দেওয়া, বা “আগে প্রতিষ্ঠানের জিনিস ফেরত দাও” বলে মাসের পর মাস আটকে রাখা।

শ্রমিকেরা যেসব বিষয়ে ভুল জানেন

  1. “ইস্তফা দিলে কিছুই পাব না”: ২০২৬ সংশোধনীর পর এক বছর পূর্ণ হলেই ক্ষতিপূরণ প্রাপ্য, আর অর্জিত ছুটি ও বকেয়া মজুরি সব ক্ষেত্রেই প্রাপ্য।
  2. “নোটিশ ছাড়া চলে গেলে সমস্যা নেই”: নোটিশ না দিলে সেই সময়ের মজুরি মালিককে দিতে হতে পারে। আর ১০ দিনের বেশি না জানিয়ে অনুপস্থিত থাকলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার পর ইস্তফা দিয়েছেন বলে গণ্য হতে পারেন।
  3. “মামলা করতে অনেক সময় আছে”: ধারা ৩৩-এর অভিযোগ কারণ জানার ৩০ দিনের মধ্যে করতে হয়। দেরি করলে অধিকার হারাতে পারেন।

বিরোধ হলে কোথায় যাবেন

  1. প্রথমে মালিককে লিখিত অভিযোগ দিন, রেজিস্টার্ড ডাকে বা হাতে হাতে প্রাপ্তিস্বীকারসহ, কারণ জানার ৩০ দিনের মধ্যে। মালিককে ৩০ দিনের মধ্যে শুনানি করে লিখিত সিদ্ধান্ত দিতে হয়।
  2. সিদ্ধান্ত না পেলে বা অসন্তুষ্ট হলে পরের ৩০ দিনের মধ্যে শ্রম আদালতে লিখিত অভিযোগ করুন। আদালত পুনর্বহাল, বকেয়া মজুরি বা শাস্তি কমানোর আদেশ দিতে পারেন। মামলায় কোর্ট ফি লাগে না।
  3. শ্রম আদালতের রায়ে অসন্তুষ্ট হলে ৩০ দিনের মধ্যে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করা যায়।
  4. মজুরি, পাওনা বা অন্যায় অবসান নিয়ে শ্রম পরিদর্শন অধিদপ্তরের টোল-ফ্রি হেল্পলাইন ১৬৩৫৭-এ অভিযোগ করা যায়, যা ২৪ ঘণ্টা চালু।
  5. মনে রাখবেন, ধারা ২৬-এর অবসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ সাধারণত চলে না, যদি না তা ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমের জন্য বা আইনগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে করা হয়ে থাকে। তখন পাওনা আদায়ের দিকেই মনোযোগ দিন।

শেষ কথা

চাকরি শেষের বিরোধের বেশির ভাগই এড়ানো যায় দুটি অভ্যাসে: মালিকের দিক থেকে সবকিছু লিখিত আর সময়মতো, শ্রমিকের দিক থেকে নিজের কাগজ গুছিয়ে রাখা আর সময়সীমা মেনে চলা। দেশের শ্রম আদালত ও ট্রাইব্যুনালে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার মামলা বিচারাধীন; আদালতে যাওয়ার আগেই হিসাব মিটিয়ে ফেলা দুই পক্ষের জন্যই সস্তা।

তথ্যসূত্র

  1. লজ অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬, ধারা ২৬ — লিংক
  2. লজ অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬, ধারা ২৭ — লিংক
  3. লজ অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬, ধারা ২০ — লিংক
  4. লজ অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬, ধারা ২৩ — লিংক
  5. লজ অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬, ধারা ৩০ — লিংক
  6. লজ অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬, ধারা ৩৩ — লিংক
  7. লজ অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬ — লিংক
  8. ঢাকা ট্রিবিউন, “National Parliament passes labour bill; layoff compensation, trade union rights among key reforms”, ৯ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক
  9. বাসস, “Govt. opens upgraded version of labour affairs helpline 16357”, ২ জুলাই ২০২৫ — লিংক
  10. দ্য ডেইলি স্টার, “Nearly 30,000 cases pending in labour courts, tribunal: Minister”, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক

এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাকরিবিধি বা চুক্তিতে বেশি সুবিধা থাকলে তা প্রযোজ্য হতে পারে; নিজের ক্ষেত্রে পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।