শ্রম আইন ২০২৬: শ্রমিক আর মালিকের জন্য কী কী বদলাল
কারখানা, দোকান, অফিস, যেখানেই কাজ করুন বা লোক খাটান, ২০২৬ সালের শ্রম আইন সংশোধনী আপনার ওপর প্রভাব ফেলবে। ৯ এপ্রিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হয়, আর ১০ এপ্রিল তা বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৪৩ নং আইন) হিসেবে প্রকাশিত হয়। এর আগে ১৭ নভেম্বর ২০২৫ একই বিষয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল; নতুন আইন সেটির জায়গা নিয়েছে।
আলোচনায় সাধারণত একটা দিকই আসে: হয় “বিরাট সংস্কার”, নয়তো “অধিকার কাটছাঁট”। বাস্তবে দুটোই আংশিক সত্য। আইনে বেশ কিছু বড় অগ্রগতি আছে, আবার অধ্যাদেশের তুলনায় কয়েকটি জায়গায় পরিধি কমেছে। দুটো দিকই পাশাপাশি দেখা যাক।
মূল কথা
- ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনে মোট শ্রমিকের ২০ শতাংশের শর্ত উঠে গেছে; এখন প্রতিষ্ঠানের আকার অনুযায়ী ২০ থেকে ৪০০ জন সদস্য লাগবে।
- মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বেড়ে ১২০ দিন, উৎসব ছুটি ১১ থেকে ১৩ দিন।
- এক প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ৩টি ইউনিয়ন (অধ্যাদেশে ছিল ৫টি); ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের কর্মীরা শ্রমিকের সংজ্ঞার বাইরে।
- আইন পুরোপুরি কাজে নামবে শ্রম বিধিমালা হালনাগাদ হলে; সেটাই এখন মূল অপেক্ষা।
বড় পরিবর্তনগুলো
- ইউনিয়ন নিবন্ধন সহজ হয়েছে। আগে প্রতিষ্ঠানের মোট শ্রমিকের ২০ শতাংশ সদস্য লাগত। এখন নির্দিষ্ট সংখ্যা: ২০–৩০০ শ্রমিকে ২০ জন, ৩০১–৫০০ শ্রমিকে ৪০ জন, ৫০১–১,৫০০ শ্রমিকে ১০০ জন, ১,৫০১–৩,০০০ শ্রমিকে ৩০০ জন, আর ৩,০০০-এর বেশি শ্রমিকে ৪০০ জন। পাঁচ হাজার শ্রমিকের কারখানায় আগে লাগত এক হাজার সদস্য, এখন ৪০০।
- মাতৃত্বকালীন ছুটি ১২০ দিন। অধ্যাদেশে এটা বাড়েনি; বেড়েছে সংসদের আইনে।
- উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে বেড়ে ১৩ দিন।
- গৃহকর্মী ও নাবিকেরা আইনের সুরক্ষার আওতায় এসেছেন।
- শ্রমিককে কালোতালিকাভুক্ত করা নিষিদ্ধ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আইনে “অন্যায়ভাবে” কালোতালিকাভুক্তির কথা বলায় বিধানটা অধ্যাদেশের চেয়ে কিছুটা নরম।
- সংসদে পাসের দিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই কাজে সমান মজুরির নীতিও জোরদার করা হয়েছে।
অধ্যাদেশ থেকে যা বদলেছে
অধ্যাদেশ আর আইন পাশাপাশি রাখলে তিনটি পার্থক্য চোখে পড়ে:
- এক প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ইউনিয়ন ৫টি থেকে কমে ৩টি।
- শ্রমিকের সংজ্ঞা সরু হয়েছে। অধ্যাদেশে “কর্মচারী” ও “কর্মকর্তা” অন্তর্ভুক্ত ছিলেন; আইনে যাঁদের লিখিত দায়িত্ব ব্যবস্থাপনা, প্রধান নির্বাহী বা প্রশাসনিক, তাঁরা বাদ। ফলে সুপারভাইজার পর্যায়ের কিছু কর্মী সুরক্ষার বাইরে যেতে পারেন। কে পড়বেন আর কে পড়বেন না, তা অনেকটা নির্ভর করবে নিয়োগপত্রে দায়িত্ব কীভাবে লেখা, তার ওপর।
- ভবিষ্য তহবিল: ১০০ বা তার বেশি স্থায়ী শ্রমিকের প্রতিষ্ঠানে দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিক লিখিতভাবে চাইলে মালিককে ভবিষ্য তহবিল করতে হয়। নতুন আইনে মালিক চাইলে তার বদলে আগ্রহী শ্রমিকদের সর্বজনীন পেনশনের “প্রগতি” স্কিমে যুক্ত করতে পারবেন, চাঁদা আধাআধি (ধারা ২৬৪)।
দুই পক্ষের প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন। মালিকদের একটি সংগঠন আইনটিকে স্বাগত জানিয়েছে। শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধানসহ শ্রমিকপক্ষের কয়েকজন নেতা বলেছেন, ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় সম্মত কিছু বিধান চূড়ান্ত আইনে আসেনি। আবার অধ্যাদেশের সময় পোশাক খাতের মালিক সংগঠনগুলো আপত্তি তুলেছিল যে কিছু বিধান ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার বাইরে যোগ হয়েছে। অর্থাৎ পদ্ধতি নিয়ে অস্বস্তি দুই দিক থেকেই এসেছে।
আমার মত: ২০ শতাংশের শর্ত ওঠাটা পঞ্চম ইউনিয়নের অনুপস্থিতির চেয়ে অনেক বড় ঘটনা; বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতায় তিনটি ইউনিয়নও যথেষ্ট জায়গা। তবে সংজ্ঞা সরু হওয়ার প্রভাব ছোট নয়। মাঝারি পর্যায়ের কর্মীদের জন্য বিষয়টা ভালো করে দেখা দরকার।
ইপিজেড আর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) চলে আলাদা আইনে। সেখানে শ্রম আইনের ট্রেড ইউনিয়ন নয়, শ্রমিক কল্যাণ সমিতি হয়। ২০২৬-এর সংশোধনী ইপিজেড ছোঁয়নি। ৩০ মার্চ ২০২৬ আইএলও পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশের শ্রম রোডম্যাপের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে ইপিজেডসহ আরও সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে, আর মার্চ ২০২৭-এ পরবর্তী অগ্রগতি প্রতিবেদন চেয়েছে।
বিষয়টা শুধু ভাবমূর্তির নয়। রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে ক্রেতা ও বাণিজ্য-অংশীদারেরা শ্রম মান নিয়মিত খেয়াল করেন, আর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় এর গুরুত্ব আরও বাড়ে।
আসল প্রশ্ন: বিধিমালা
আইনে সংখ্যা লেখা থাকলেও নিবন্ধনের ফরম, কাগজপত্র আর যাচাইয়ের ধাপ ঠিক করে বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫। নতুন আইন অনুযায়ী বিধিমালা হালনাগাদের প্রকাশ্য কোনো খবর এখনো পাওয়া যায়নি। বিধিমালা না বদলালে নতুন সুবিধার অনেকটাই খাতায় থেকে যেতে পারে।
শ্রমিক হলে যা করবেন
- নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র হাতে রাখুন; পদের নাম আর দায়িত্ব কীভাবে লেখা, তা দেখুন। সংজ্ঞার প্রশ্ন উঠলে এটাই প্রমাণ।
- মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য সম্ভাব্য প্রসবের তারিখসহ লিখিত আবেদন দিন, কপি রাখুন।
- ইউনিয়ন করতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের মোট শ্রমিক সংখ্যা অনুযায়ী ন্যূনতম সদস্য সংখ্যা মিলিয়ে নিন, আর শ্রম অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়ে খোঁজ নিন।
- ছাঁটাই, বরখাস্ত বা পাওনা নিয়ে বিরোধ হলে কাগজপত্র গুছিয়ে রাখুন। শ্রম আদালতে যাওয়ার সময়সীমা আছে, তাই দেরি না করে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।
মালিক হলে যা করবেন
- নিয়োগপত্রে প্রত্যেক কর্মীর দায়িত্ব স্পষ্ট করে লিখুন; ব্যবস্থাপনা পদের ক্ষেত্রে এটা আরও জরুরি।
- ছুটির নীতি ১২০ দিনের মাতৃত্বকালীন ও ১৩ দিনের উৎসব ছুটি অনুযায়ী হালনাগাদ করুন।
- ১০০ বা বেশি স্থায়ী শ্রমিক থাকলে ভবিষ্য তহবিল না পেনশন স্কিম, সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত রাখুন।
- কালোতালিকা বা শ্রমিকের তথ্য অনানুষ্ঠানিকভাবে আদান-প্রদানের চর্চা থাকলে এখনই বন্ধ করুন।
শেষ কথা
এই সংশোধনী একই সঙ্গে অগ্রগতি আর আপস। সংস্কার কতটা কাজে লাগল, তা বোঝা যাবে আইনের পাঠে নয়; আগামী এক বছরে কতগুলো ইউনিয়ন নিবন্ধন পেল, আর কতজন মা পুরো ১২০ দিন ছুটি পেলেন, সেই সংখ্যায়।
তথ্যসূত্র
- লজ অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৪৩ নং আইন) — লিংক
- লজ অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬, ধারা ২৬৪ — লিংক
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Parliament passes labour bill; layoff compensation, trade union rights among key reforms”, ৯ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Labour law amendment to deprive many employees of protections: Experts”, ১১ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক
- জাগো নিউজ, “২০ জনের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন, মাতৃত্বকালীন ছুটি ১২০ দিন”, ১১ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক
- দ্য ডেইলি স্টার, “A closer look at Bangladesh’s new labour law: Gains and gaps”, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক
- আইএলও, “Decision concerning the report by the Government of Bangladesh on progress made in the implementation of the road map to address all outstanding issues mentioned in the article 26 complaint”, ৩০ মার্চ ২০২৬ — লিংক
এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য ও মতামত, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। আইন ও বিধি সময়ে সময়ে বদলায়; নির্দিষ্ট বিষয়ে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

অ্যাকাউন্ট থাকলে প্রতিবার তথ্য লিখতে হয় না, আর মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। লগইন বা নিবন্ধন করুন