বাড়িভাড়া নিয়ে ডিএনসিসির ১৬ নির্দেশনা: ভাড়াটিয়া আর বাড়িওয়ালার যা জানা দরকার
ঢাকায় ভাড়া থাকা পরিবারের জন্য বছরের সবচেয়ে অস্বস্তির দিন সম্ভবত সেটা, যেদিন বাড়িওয়ালা জানান সামনের মাস থেকে ভাড়া বাড়ছে। কত বাড়বে, কেন বাড়বে, কবে থেকে, তিন প্রশ্নেরই উত্তর থাকে এক পক্ষের হাতে।
২০ জানুয়ারি ২০২৬ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এ নিয়ে ১৬ দফা নির্দেশিকা দিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে ডিএনসিসির প্রশাসক জানান, ঢাকায় প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বাস, অথচ দুই সিটি মিলিয়ে বাড়ি ২০ থেকে ২৫ লাখ। অনেক পরিবার আয়ের অর্ধেকের বেশি খরচ করে ভাড়ায়।
নির্দেশিকাটা কাজের। তবে এটা কী, আর কী নয়, দুটোই বুঝে রাখা দরকার। না হলে ভাড়াটিয়া ভুল প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলতে যাবেন, আর বাড়িওয়ালা অকারণে বিরোধে জড়াবেন।
মূল কথা
- ডিএনসিসির নির্দেশিকা: দুই বছরের আগে ভাড়া বাড়ানো যাবে না, বাড়ানো যাবে শুধু জুন–জুলাইয়ে; প্রতি মাসে লিখিত রসিদ ও লিখিত চুক্তি দিতে হবে।
- বছরের মোট ভাড়া বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি না হওয়ার সূত্রটা নতুন নয়; এটা বাড়ী ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর ১৫ ধারার।
- আইনে নিয়ন্ত্রকের অনুমতি ছাড়া এক মাসের বেশি অগ্রিম নেওয়া নিষেধ (ধারা ১০); নির্দেশিকায় ১–৩ মাসের কথা আছে। এই অমিলটা খেয়াল রাখুন।
- বিরোধ হলে প্রথমে ওয়ার্ড পর্যায়ের বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া সমিতি, তারপর ডিএনসিসির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা।
নির্দেশিকায় যা আছে
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ১৬ দফার মূল কথাগুলো:
- দুই বছরের আগে ভাড়া বাড়ানো যাবে না; এরপরও বাড়াতে হবে দুই পক্ষের সম্মতিতে, আর শুধু জুন–জুলাই মাসে।
- বার্ষিক ভাড়া বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।
- ভাড়া দিতে হবে মাসের ১০ তারিখের মধ্যে, আর প্রতি মাসে লিখিত রসিদ দিতে হবে।
- লিখিত ভাড়াচুক্তি করতে হবে।
- বাসা ছাড়তে বা ছাড়াতে দুই পক্ষকেই দুই মাস আগে নোটিশ দিতে হবে।
- শর্তসাপেক্ষে ছাদ ও মূল ফটকের চাবি ব্যবহারের সুযোগ, আর পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের মতো সেবা চালু রাখা।
শেষ দুটি দফা অনেক পরিবারের রোজকার ঝামেলার জায়গা। লিখিত নিয়ম হওয়ায় কথা বলার সময় এগুলো কাজে লাগবে।
আইনটা আছে ১৯৯১ সাল থেকে
“বাংলাদেশে বাড়িভাড়ার আইন নেই”, কথাটা প্রায়ই শোনা যায়। এটা ঠিক নয়। বাড়ী ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ আছে, আর এটা ঢাকা উত্তর বা দক্ষিণ, দুই সিটিতেই প্রযোজ্য। এর কয়েকটা বিধান প্রত্যেক ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালার জানা দরকার:
- ধারা ১০: সেলামি, প্রিমিয়াম বা জামানত নেওয়া যাবে না; নিয়ন্ত্রকের পূর্বানুমতি ছাড়া এক মাসের বেশি ভাড়া অগ্রিম নেওয়া যাবে না।
- ধারা ১৩: ভাড়া নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িওয়ালাকে সই করা রসিদ দিতে হবে।
- ধারা ১৫: নিয়ন্ত্রক “মানসম্মত ভাড়া” ঠিক করবেন, যার বার্ষিক পরিমাণ বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশ।
- ধারা ১৬: মানসম্মত ভাড়া প্রতি দুই বছর পরপর আবেদনের ভিত্তিতে নতুন করে ঠিক করা যায়।
- ধারা ২৩: মানসম্মত ভাড়ার বেশি আদায় করলে প্রথমবার বাড়তি অঙ্কের দ্বিগুণ পর্যন্ত, পরের বার থেকে তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানা।
অর্থাৎ ১৫ শতাংশের সূত্রটা ডিএনসিসির নতুন উদ্ভাবন নয়, আইনেরই পুনরুচ্চারণ। দুই বছরের নিয়মটাও এসেছে আইনের দুই বছর পরপর ভাড়া পুনর্নির্ধারণের ধারণা থেকে, যদিও “দুই বছরের আগে একেবারেই বাড়ানো যাবে না” কথাটা নির্দেশিকার নিজস্ব ভাষা।
একটা জায়গায় অমিলও আছে। আইনে নিয়ন্ত্রকের অনুমতি ছাড়া এক মাসের বেশি অগ্রিম নিষেধ, অথচ নির্দেশিকায় ১–৩ মাসের অগ্রিমের কথা এসেছে। দুটো সাংঘর্ষিক হলে সংসদের আইনই প্রাধান্য পায়।
তাহলে সমস্যা কোথায়
সমস্যা আইন চালানোর যন্ত্রে। ১৫ ধারা বলছে, বাজারমূল্য ঠিক হবে বিধিতে বলা পদ্ধতিতে। কিন্তু বণিক বার্তার ৩১ জানুয়ারি ২০২৬-এর সম্পাদকীয় বলছে, আইনটি বাস্তবায়নের বিধিমালা আজও হয়নি। বাস্তবে এ আইনের আবেদন শোনেন সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, কিন্তু সাধারণ ভাড়াটিয়া সেখানে খুব কমই যান।
১ জুলাই ২০১৫ হাইকোর্ট একটি রিট মামলায় এলাকাভিত্তিক সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভাড়া সুপারিশের জন্য একটি কমিশন গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন; প্রতি ওয়ার্ডে ভাড়া নিয়ন্ত্রক নিয়োগের কথাও ছিল। সেই কমিশন গঠনের খবর এখনো পাওয়া যায় না।
নির্দেশিকার আইনি ওজনও সীমিত। বিরোধ যাবে ওয়ার্ড সমিতি আর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে; দুটোর কোনোটাই আদালত নয়। বাড়িওয়ালা না মানলে কী ব্যবস্থা হবে, প্রকাশিত নির্দেশিকায় তা স্পষ্ট নয়।
তবু নির্দেশিকাটা কাজে লাগে
- একটা লিখিত মানদণ্ড তৈরি হলো। কথা বলার সময় লিখিত নিয়ম মুখের কথার চেয়ে ভারী।
- রসিদ আর চুক্তির অভ্যাস তৈরি হলে পরে বিরোধ প্রমাণ করা সহজ হয়।
- ওয়ার্ড পর্যায়ে একটা জায়গা হলো, যেখানে ভাড়াটিয়া একা নন।
বাড়িওয়ালার দিক থেকেও এটা লাভের। লিখিত চুক্তি আর রসিদ থাকলে ভাড়া বাকি রাখা বা নোটিশ ছাড়া চলে যাওয়ার মতো বিরোধে তাঁর পক্ষেও প্রমাণ থাকে।
ভাড়াটিয়া আজ যা করবেন
- লিখিত চুক্তি চান। না পেলে অন্তত মেসেজে ভাড়া, অগ্রিম, সার্ভিস চার্জ আর নোটিশের শর্ত লিখে রাখুন।
- ভাড়া ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দিন। নগদে দিলে প্রতি মাসে সই করা রসিদ নিন।
- অগ্রিম কত দিলেন, তার লিখিত স্বীকৃতি নিন। বাসা ছাড়ার সময় সবচেয়ে বেশি ঝগড়া হয় এই টাকা নিয়েই।
- ভাড়া বাড়ানোর কথা এলে লিখিত নোটিশ চান, আর মিলিয়ে দেখুন শেষবার কবে বেড়েছিল।
- মীমাংসা না হলে ওয়ার্ড সমিতি, তারপর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা। বড় অঙ্কের বিরোধে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে আদালতের পথও ভাবুন।
বাড়িওয়ালা যা করবেন
- লিখিত চুক্তি আর মাসিক রসিদ দিন; এতে আপনার নিজের অধিকারও লিখিত থাকে।
- ভাড়া বাড়াতে চাইলে জুন–জুলাইয়ের আগেই লিখিত নোটিশ দিন, আর কারণ জানান।
- অগ্রিম এক মাসের মধ্যে রাখাই আইনের দিক থেকে সবচেয়ে নিরাপদ।
শেষ কথা
নির্দেশিকা থাকুক, সঙ্গে আইনের বিধিমালাও হোক। আপাতত দুই পক্ষের জন্য সবচেয়ে সহজ সুরক্ষা একটাই: সবকিছু লিখিত রাখা। রসিদ, চুক্তি আর নোটিশ, এই তিনটা কাগজ থাকলে বেশির ভাগ বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায় না।
তথ্যসূত্র
- লজ অব বাংলাদেশ, বাড়ী ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ — লিংক
- দ্য ডেইলি স্টার, “No rent hike in 2 years, tenants must have access to roof and main gate”, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ — লিংক
- বিডিনিউজ২৪, “DNCC sets 16 rules for landlords, rent hikes allowed every 2 years”, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ — লিংক
- নয়া দিগন্ত, “২ বছরের আগে বাড়ি ভাড়া বাড়ানো যাবে না”, ২০ জানুয়ারি ২০২৬ — লিংক
- বণিক বার্তা, “ডিএনসিসির নতুন বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি নতুন দুর্ভোগ”, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ — লিংক
- ঢাকা ট্রিবিউন, “High Court orders for a house rent commission”, ১ জুলাই ২০১৫ — লিংক
এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য ও মতামত, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। নিজের বিরোধের ক্ষেত্রে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।

অ্যাকাউন্ট থাকলে প্রতিবার তথ্য লিখতে হয় না, আর মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। লগইন বা নিবন্ধন করুন