মশা সিটি করপোরেশনের, কিন্তু জমা পানিটা আপনার ছাদে
ডেঙ্গুর দায় কোনো এক পক্ষের নয়। রাস্তা, নালা আর সরকারি জায়গায় মশা নিয়ন্ত্রণ সিটি করপোরেশনের কাজ। কিন্তু বাড়ির ছাদ, বেসমেন্ট, ফুলের টব আর নির্মাণাধীন ভবনের জমা পানির দায় মালিক, ভাড়াটে আর ঠিকাদারের। সেখানে লার্ভা পেলে সিটি করপোরেশন আইনে জরিমানা হয়।
আমরা মশা মারার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাই। অথচ মশাটা জন্মাচ্ছে আমাদেরই ছাদের ড্রামে। ব্যাপারটা অনেকটা নিজের বাসার কল খোলা রেখে ওয়াসাকে পানির অপচয় নিয়ে চিঠি লেখার মতো।
এ কথা বলার মানে সিটি করপোরেশনকে ছাড় দেওয়া নয়। নিচে দুই পক্ষের হিসাবই আছে।
মূল কথা
- ২২ সেপ্টেম্বর এক দিনে ১,৮৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, এ বছরের সর্বোচ্চ।
- ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বছর ভর্তি ৬৯,১৪৯ জন, মৃত্যু ২০৯। সেপ্টেম্বরই এ বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস।
- বিশেষজ্ঞদের জরিপে ঢাকায় এডিসের প্রজননের বড় অংশ ড্রাম, বালতি, বেসমেন্ট আর পানির মিটারে।
- ফগিং মূলত উড়ন্ত মশা মারে, লার্ভা আর ডিম থেকে যায়।
- লার্ভা পেলে সিটি করপোরেশন আইনের ৯২ ধারায় ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করতে পারে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন কতটা খারাপ?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হিসাবে ২৪ ঘণ্টায় ১,৮৭২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এক দিনের হিসাবে এটাই এ বছরের সর্বোচ্চ। আগের রেকর্ড ছিল ১৬ সেপ্টেম্বরের ১,৭৫৩ জন, অর্থাৎ রেকর্ডটা এক সপ্তাহও টেকেনি। চাপ কমেনি: ২৪ সেপ্টেম্বরের হিসাবে ২৪ ঘণ্টায় আরও ১,৭৮২ জন ভর্তি হয়েছেন, মারা গেছেন ৮ জন। জানুয়ারি থেকে এ বছর ভর্তি হয়েছেন ৬৯,১৪৯ জন, মৃত্যু ২০৯। শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই মারা গেছেন ১১৩ জন, এ বছর আর কোনো মাসে এত মৃত্যু হয়নি।
তুলনার জন্য, ২০২৫ সালে সারা বছরে ১,০২,৮৬১ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন, মারা গিয়েছিলেন ৪১৩ জন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁর পূর্বাভাস মডেলের ভিত্তিতে বলেছেন, অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আর এই সংখ্যাগুলো শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীর। অধিদপ্তর সারা দেশে মাত্র ১৩৯টি হাসপাতালের তথ্য নেয়। বাসায় চিকিৎসা নেওয়া রোগী এই হিসাবের বাইরে।
এডিস মশা আসলে কোথায় জন্মায়?
বেশির ভাগই আমাদের ঘরের আশপাশে। ১২ সেপ্টেম্বরের ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে অধ্যাপক কবিরুল বাশার জানান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক জরিপে ঢাকার এডিস প্রজননের প্রায় ৭০ শতাংশ পাওয়া গেছে হাতে গোনা কয়েক ধরনের জায়গায়। শুধু ড্রাম, বালতি, বেসমেন্টের পার্কিং আর ওয়াসার পানির মিটারের গর্ত মিলিয়েই ৬০ শতাংশের বেশি।
এর প্রায় সবই ব্যক্তিগত জায়গা। সিটি করপোরেশনের মশককর্মী আপনার বেসমেন্টে ঢুকতে পারেন না, ফ্রিজের নিচের ট্রে দেখতে পারেন না, তালাবন্ধ ছাদেও উঠতে পারেন না। মশা অবশ্য তালার তোয়াক্কা করে না।
ফগিং কি ডেঙ্গু ঠেকায়?
একা ফগিং ডেঙ্গু ঠেকায় না। ডেইলি স্টারের একই প্রতিবেদনের ভাষায়, ফগিং মূলত উড়ন্ত পূর্ণবয়স্ক মশাকে লক্ষ্য করে এবং সাময়িক স্বস্তি দেয়, প্রজননস্থলের ডিম আর লার্ভা সরায় না। কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ তাই উৎস ধ্বংস (source reduction)। প্রজননস্থল সরানো, যেখানে সরানো সম্ভব নয় সেখানে লার্ভিসাইড দেওয়া।
তবু ফগিং জনপ্রিয়, কারণ ধোঁয়া চোখে দেখা যায়। এক গলি ধোঁয়া দেখলে মনে হয় কাজ হচ্ছে। ছাদের ড্রাম উল্টে দেওয়ার কাজটা কেউ দেখে না, ছবিও ওঠে না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর কাজটাই সবচেয়ে কম দৃশ্যমান, সমস্যার একটা বড় অংশ এখানেই।
কার দায় কতটুকু?
- ভাড়াটে বা যিনি ফ্ল্যাটে থাকেন: ফ্ল্যাটের ভেতরের পাত্র, টব, ফ্রিজ ও এসির পানি, বারান্দা। চুক্তিতে যা-ই লেখা থাকুক, এগুলো আপনি ছাড়া আর কেউ রোজ দেখেন না।
- বাড়ির মালিক বা ফ্ল্যাট মালিক সমিতি: ছাদ, পানির ট্যাংক, সিঁড়িঘর, বেসমেন্ট পার্কিং, মিটারের গর্ত। অভিযানের খবরে জরিমানা সাধারণত মালিক বা পরিবারকেই হতে দেখা যায়।
- নির্মাণ ঠিকাদার ও ডেভেলপার: ঢালাইয়ের কিউরিং পানি, লিফটের গর্ত, খোলা ড্রাম। অতীতে নির্মাণাধীন ভবনে লার্ভা পেয়ে ঠিকাদারকে জরিমানার নজিরও আছে।
- সিটি করপোরেশন: নালা, জলাশয়, সরকারি জায়গা, লার্ভিসাইড, নিয়মিত জরিপ, আর আইনের প্রয়োগ।
- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর: রোগীর তথ্য, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আর জাতীয় পর্যায়ের এডিস জরিপ।
ভাড়াটে আর মালিকের মধ্যে ডেঙ্গুর দায় ভাগ করে দেয় এমন নির্দিষ্ট কোনো বিধান আমার চোখে পড়েনি। ওপরের ভাগটা তাই বাস্তব কাণ্ডজ্ঞানের, আইনের তালিকা নয়। তবে জরিমানার রসিদ সাধারণত মালিকের নামেই কাটা হয়। কাজেই ছাদে তালা দিয়ে চাবি পকেটে রাখলে ছাদের দায়ও পকেটেই থাকে।
ভাড়াটে হিসেবে ছাদে বা বেসমেন্টে জমা পানি দেখলেন, অথচ মালিক গা করছেন না? মুখে বলার পর একটা ছোট লিখিত বার্তা পাঠান, তারিখ আর ছবিসহ। তাতেও কাজ না হলে সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড অফিস বা আঞ্চলিক কার্যালয়ে জানান। ঝগড়ার দরকার নেই। কাগজে রেখে দেওয়াটাই যথেষ্ট, পরে কে কখন জেনেছিলেন সেই প্রশ্ন উঠলে ওটাই কাজে লাগবে।
লার্ভা পেলে কোন আইনে জরিমানা হয়?
মূল ভিত্তি স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯। এর ৯২ ধারা বলে, আইনের পঞ্চম তফসিলে বর্ণিত অপরাধগুলো দণ্ডনীয়। ৯৩ ধারায় যেসব অপরাধের আলাদা দণ্ড নির্দিষ্ট নেই, সেগুলোর জন্য পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, আর অপরাধ চলতে থাকলে প্রতিদিন আরও পাঁচশো টাকা পর্যন্ত। বাস্তবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত (mobile court) বসিয়ে ঘটনাস্থলেই এই জরিমানা করেন।
বাস্তবে কেমন হয়, দুটো উদাহরণ। দৈনিক পূর্বকোণের খবর অনুযায়ী, ২৩ আগস্ট চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে এক বাড়ির মালিককে লার্ভা পাওয়ায় সিটি করপোরেশন আইনের ৯২ ধারায় তিন হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আর ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিরপুর, পল্লবী, আগারগাঁও, উত্তরা, বারিধারাসহ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২৮টি মামলায় মোট ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেন। অভিযানটি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত তিন মাসের জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ, যা চলবে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
দণ্ডবিধির ২৬৯ ধারাও আছে। জীবনঘাতী রোগের সংক্রমণ ছড়াতে পারে জেনেও বেআইনি বা অবহেলাজনিত কাজ করলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা। লার্ভার ক্ষেত্রে এই ধারার প্রয়োগের খবর আমি পাইনি। তবে ধারাটা মনে করিয়ে দেয়, অন্যের জীবনের ঝুঁকি তৈরি করা অবহেলা আইনের চোখে নিছক অভদ্রতা নয়।
বাসায় সপ্তাহে দশ মিনিটের চেকলিস্ট
প্রতি সপ্তাহে একটা নির্দিষ্ট দিন ঠিক করুন, ধরুন শুক্রবার সকাল। তারপর এই ক্রমে ঘুরে আসুন।
- ফ্রিজের নিচের ট্রে আর এসির পানি পড়ার পাত্র খালি করে মুছে ফেলুন।
- ফুলের টবের নিচের প্লেট আর বারান্দার বোতল বা পাত্রের পানি ফেলে দিন।
- পানি ধরে রাখতেই হলে ড্রাম আর বালতি শক্ত ঢাকনা দিয়ে বন্ধ রাখুন। খালি পাত্র উপুড় করে রাখুন।
- ছাদে উঠে পুরোনো টায়ার, ভাঙা পাত্র, প্লাস্টিকের মোড়ক সরান। ছাদের যে কোণে পানি জমে, সেটা খেয়াল করুন।
- বেসমেন্ট পার্কিং আর পানির মিটারের গর্তে জমা পানি আছে কি না দেখুন। থাকলে মালিক বা সমিতিকে জানান।
- পাশের প্লটে নির্মাণকাজ চললে সেখানে জমা পানির ছবি তুলে সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড অফিসে জানান।
- পরিবারের কারও ডেঙ্গু হলে ঘরের মশা নির্মূলে বাড়তি নজর দিন। অধ্যাপক বাশারের পরামর্শ, আক্রান্ত রোগীর ঘর থেকেই সংক্রমণ অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে।
সিটি করপোরেশন আর অধিদপ্তরের হিসাব কী?
এবার অন্য পক্ষের কথা, একই রকম খোলাখুলি। ডেইলি স্টারের হিসাবে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত ১১ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা খরচ করেছে, তবু প্রাদুর্ভাব থামেনি। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের ১১টিতে কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। অর্থের অভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৫ সালে কোনো জাতীয় এডিস জরিপ করতে পারেনি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের জন্যও কোনো জরিপের পরিকল্পনা ছিল না।
অর্থাৎ নাগরিককে লার্ভার জন্য জরিমানা করা হচ্ছে, অথচ কোন ওয়ার্ডে লার্ভার ঘনত্ব কত, সেই তথ্য রাষ্ট্রের হাতেই নেই। থার্মোমিটার ছাড়া জ্বর মাপার মতো ব্যাপার।
শেষ কথা: জরিমানার সঙ্গে তথ্যও প্রকাশ হোক
মারা যাওয়া প্রতিটি মানুষের পেছনে একটা পরিবার আছে, যাঁদের কাছে এই পরিসংখ্যান কোনো সংখ্যা নয়। তাঁদের প্রতি সম্মান দেখানোর সবচেয়ে কাজের উপায় হলো দায়টা ঠিকঠাক ভাগ করা। নাগরিকের দায় নিজের ছাদ আর বেসমেন্ট। রাষ্ট্রের দায় তথ্য, দক্ষ লোক আর নিয়মের সমান প্রয়োগ।
আমার প্রস্তাব দুটো, দুটোই নতুন আইন ছাড়া করা যায়। এক, প্রতিটি সিটি করপোরেশন প্রতি মাসে ওয়ার্ডভিত্তিক লার্ভা জরিপের ফল আর জরিমানার তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে। তাহলে বাসিন্দারা জানবেন, তাঁদের ওয়ার্ডে ঝুঁকি কত আর ওয়ার্ড অফিসকে কী প্রশ্ন করতে হবে। দুই, নির্মাণ অনুমোদনের সময় ডেভেলপারের কাছ থেকে একটা ফেরতযোগ্য “ডেঙ্গু জামানত” নেওয়া হবে, যা একই প্রকল্পে বারবার লার্ভা পেলে বাজেয়াপ্ত হবে। ঠিকাদারের কাছে তিন হাজার টাকার জরিমানা একটা ছোট খরচ মাত্র। জামানত হারানোর ভয় তাঁর হিসাব বদলে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Dengue claims 5 more lives in 24hrs, daily hospital admissions hit record 1,872”, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
- দ্য ডেইলি স্টার, “2 more die of dengue, 220 hospitalised in 24 hours” (২০২৫ সালের মোট হিসাবসহ), ২১ জুন ২০২৬ — লিংক
- দ্য ডেইলি স্টার, “Dengue spreads amid weak mosquito control”, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Dengue situation likely to worsen further in Oct: Expert”, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
- ঢাকা ট্রিবিউন, “DNCC fines Tk 1.77 lakh over Aedes larvae in Dhaka homes”, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
- প্রথম আলো (ইংরেজি), “Dengue: PM Tarique Rahman launches 3-month nationwide prevention campaign”, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
- দৈনিক পূর্বকোণ, “আগ্রাবাদে ভবনে মশার লার্ভা পাওয়ায় বাড়িওয়ালাকে জরিমানা”, ২৩ আগস্ট ২০২৬ — লিংক
- লজ অব বাংলাদেশ, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ (ধারা ৯২, ৯৩) — লিংক
- বিডিনিউজ২৪, “Eight more die from dengue, another 1,782 hospitalised”, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
হালনাগাদ, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ২৪ সেপ্টেম্বরের সরকারি হিসাব যোগ করা হয়েছে। দৈনিক ভর্তির রেকর্ড এখনো ২২ সেপ্টেম্বরের ১,৮৭২ জন।
এই লেখা সাধারণ আইনি ও নীতিগত তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

অ্যাকাউন্ট থাকলে প্রতিবার তথ্য লিখতে হয় না, আর মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। লগইন বা নিবন্ধন করুন