মক্কেলরা যে প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি করেন: “এটা কি ন্যায্য?”
“স্যার, আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। জমিটা আমার, সবাই জানে। তাহলে আমার মামলা চার বছর ধরে চলছে কেন?”
এই প্রশ্নটা নানা চেহারায় আসে। কখনো দেনমোহরের টাকা না পাওয়া একজন মা, কখনো পাওনা আটকে থাকা ছোট ব্যবসায়ী, কখনো মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়া কোনো তরুণ। শব্দ আলাদা, প্রশ্ন একটাই: এটা কি ন্যায্য?
আইনজীবী হিসেবে প্রশ্নটার একটা সহজ উত্তর আমার জানা আছে: আইন কী বলে, আদালত কী দেখবেন, সম্ভাবনা কতটা। কিন্তু প্রশ্নটা আসলে আইনের নয়। আর সৎ উত্তরটা অস্বস্তিকর।
কেন সৎ উত্তরটা অস্বস্তিকর
কারণ আদালত “কে ঠিক” সেই প্রশ্নের উত্তর দেন না; দেন “কে প্রমাণ করতে পারল” সেই প্রশ্নের। আপনার জমি হয়তো সত্যিই আপনার, কিন্তু দলিল, খতিয়ান আর নামজারি ঠিক না থাকলে আদালতের কাছে সেই সত্য দুর্বল। আপনার দাবি হয়তো পুরোপুরি ন্যায্য, কিন্তু নোটিশ এক দিন দেরিতে গেলে বা তামাদির মেয়াদ পার হলে সেই দাবি আর টেকে না।
আরেকটা অস্বস্তিকর সত্য হলো সময়। যে পক্ষ অপেক্ষা করতে পারে, টাকা খরচ করতে পারে, তারিখের পর তারিখ হাজিরা দিতে পারে, ব্যবস্থা প্রায়ই তার পক্ষে কাজ করে। ন্যায্য দাবিদার অনেক সময় হারেন না, ক্লান্ত হয়ে সরে যান।
এটা ব্যবস্থাটা সম্পর্কে কী বলে
দেশে বিচারাধীন মামলা এখন ৪৬ লাখের বেশি; আইনমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো দেওয়ানি মামলাই তিন লাখ ৭৭ হাজারের বেশি। এই সংখ্যার ভেতরে প্রতিটি মামলা একজন মানুষের অপেক্ষা।
এটা কোনো একজন বিচারক বা একটা দপ্তরের দোষ নয়। বিচারক কম, মামলা বেশি, প্রক্রিয়া পুরোনো, আর মুলতবি নেওয়ার সুযোগ অনেক। এর সঙ্গে যোগ হয় মিথ্যা মামলা আর হয়রানির মামলা, যা আসল মামলার সময় কেড়ে নেয়। মামলার আগে মধ্যস্থতা, বাণিজ্যিক আদালত, এসব উদ্যোগ এই চাপ কমানোর চেষ্টা; কতটা কাজ করছে, তা এখনো মাপা বাকি।
এটা যা ক্ষমা করে না
ব্যবস্থার সীমা আছে বলে ব্যক্তির দায় শেষ হয়ে যায় না। বরং উল্টো। যে ব্যবস্থা ধীর আর প্রমাণনির্ভর, সেখানে নিজের কাজটুকু ঠিকঠাক করা আরও জরুরি।
- মক্কেলের দায়: কাগজ গুছিয়ে রাখা, সত্য বলা (নিজের আইনজীবীর কাছেও), তারিখে হাজির থাকা, আর আপসের সুযোগ এলে তা খোলা মনে ভাবা।
- আইনজীবীর দায়: সম্ভাবনা নিয়ে সৎ থাকা, সময় আর খরচের বাস্তব ধারণা দেওয়া, আর যে মামলার উদ্দেশ্য শুধু হয়রানি, তাতে না জড়ানো।
- প্রতিপক্ষের দায়ও আছে: মিথ্যা মামলা বা মামলা ঝুলিয়ে রাখা কৌশল হতে পারে, কিন্তু তা অন্যায়ও।
“ব্যবস্থা খারাপ” কথাটা সত্য হতে পারে, কিন্তু সেটা নিজের গাফিলতির অজুহাত নয়।
আমি নিজে যা বদলেছি
প্রশ্নটা বারবার শুনতে শুনতে নিজের কাজের ধরনে কয়েকটা জিনিস বদলেছি।
- প্রথম সাক্ষাতেই সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনাটাও বলি, শুধু ভালোটা নয়। আশা দেওয়া সহজ; বাস্তব ধারণা দেওয়া বেশি দরকারি।
- মামলায় কত সময় লাগতে পারে আর মোটামুটি কত খরচ হতে পারে, তার একটা ধারণা শুরুতেই দিই, আর বলে রাখি কোন কোন কারণে তা বাড়তে পারে।
- যেখানে সম্ভব, মামলার আগে আলোচনা বা মধ্যস্থতার পথ আগে ভাবতে বলি। সব বিরোধের সমাধান রায়ে নয়।
- যে মামলার একমাত্র উদ্দেশ্য অন্যকে হয়রানি করা বলে মনে হয়, তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি।
এগুলো কোনো বড় সংস্কার নয়। কিন্তু “এটা কি ন্যায্য?” প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে একজন আইনজীবী অন্তত এটুকু নিশ্চিত করতে পারেন: মক্কেল যেন জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নেন।
আপনি যদি এখন মামলার মধ্যে থাকেন
- নিজের মামলার সব কাগজের একটা কপি নিজের কাছে রাখুন, আর প্রতিটি তারিখ ও আদেশ লিখে রাখুন।
- আইনজীবীর কাছে জানতে চান: সবচেয়ে ভালো, সবচেয়ে খারাপ আর সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল কী, আর কত সময় লাগতে পারে।
- আপস বা মধ্যস্থতার সুযোগ থাকলে তা বিবেচনা করুন; ক্লান্ত হয়ে হারার চেয়ে বুঝেশুনে মীমাংসা অনেক সময় ভালো।
- কোনো সময়সীমা (আপিল, নোটিশ, তামাদি) যেন পার না হয়, সেদিকে নিজেও খেয়াল রাখুন।
মামলার আগে মধ্যস্থতা কীভাবে কাজ করে, পড়ুন: মামলা ৬২ শতাংশ কমেছে। বিরোধও কি ততটা মিটেছে?
তথ্যসূত্র
- দ্য ডেইলি স্টার, “Over 46 lakh cases pending across courts in Bangladesh: Law minister”, ৭ জুলাই ২০২৬ — লিংক
এই লেখা ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও মতামত, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আইনি পরামর্শ নয়। শুরুর উদাহরণগুলো নানা অভিজ্ঞতা মিলিয়ে লেখা; কোনো নির্দিষ্ট মক্কেলের তথ্য নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ।

অ্যাকাউন্ট থাকলে প্রতিবার তথ্য লিখতে হয় না, আর মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। লগইন বা নিবন্ধন করুন