আমরা নিয়ম বানাই মানুষকে অবিশ্বাস করে — এবং সেটাই সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভুল

আমরা নিয়ম বানাই মানুষকে অবিশ্বাস করে, আর সেটাই সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভুল

সিটি করপোরেশন বা পৌরসভায় ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে গেছেন? রিটার্ন জমার প্রমাণ লাগবে, এখন বিআইএনও লাগবে। ব্যাংকে ব্যবসার হিসাব খুলবেন? বিআইএন বা ভ্যাট তালিকাভুক্তির প্রমাণ। ভ্যানে পিঁয়াজু বিক্রি করবেন? নিরাপদ খাদ্যের নিবন্ধন। প্রতিটি নিয়মের পেছনে একটা যুক্তি আছে, আর আলাদাভাবে দেখলে প্রতিটিই যুক্তিসঙ্গত মনে হয়।

সমস্যা দেখা যায় সবগুলো একসঙ্গে রাখলে। তখন একটা নকশা চোখে পড়ে: আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা শুরুতেই ধরে নেয়, প্রত্যেক নাগরিক সম্ভাব্য প্রতারক। ফলে অল্প কিছু অসৎ মানুষ ধরতে গিয়ে সৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর একটা কর বসে, যা কোনো বাজেটে লেখা থাকে না: সময়ের কর।

মূল কথা

  • আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৪ ধারায় এখন ৪০টি সেবার জন্য রিটার্ন জমার প্রমাণ (পিএসআর) লাগে; অর্থ আইন, ২০২৬ এই তালিকা আরও বাড়িয়েছে।
  • অর্থ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব, ঋণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন আর এমএফএস মার্চেন্ট হিসাবে বিআইএন বা তালিকাভুক্তির প্রমাণ বাধ্যতামূলক।
  • একটি বড় খাদ্য প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের ১৭টি দপ্তর থেকে লাইসেন্স-নিবন্ধন নিতে হয়; প্লাস্টিক বর্জ্য খাতে একটি প্রতিষ্ঠানের ৩১টি লাইসেন্স আর প্রায় ৬৫০ দিন লাগার কথা এসেছে।
  • উল্টো নকশা: শুরুতে বিশ্বাস, নমুনা ধরে যাচাই, আর ধরা পড়লে কঠোর শাস্তি; তবে ব্যাংক, জমি আর ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যে আগাম যাচাই দরকার।

তিনটি পরিচিত উদাহরণ

উদাহরণ ১: রিটার্ন জমার প্রমাণ। কর ফাঁকি ঠেকাতে আয়কর আইনের ২৬৪ ধারায় একটা তালিকা আছে: ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধন, শহর এলাকায় জমি-ফ্ল্যাট নিবন্ধনসহ নানা কাজে রিটার্ন জমার প্রমাণ দেখাতে হয়। অর্থ আইন, ২০২৬ এই তালিকায় আরও একটি কাজ যোগ করে সংখ্যাটা ৪০-এ নিয়েছে। উদ্দেশ্য বোঝা যায়। কিন্তু খেয়াল করুন, যিনি নিয়মিত রিটার্ন দেন, তাঁকেও প্রতিবার প্রমাণ বয়ে বেড়াতে হয়। অথচ এনবিআরের কাছে তথ্যটা আগে থেকেই আছে।

উদাহরণ ২: ছোট বিক্রেতার নিবন্ধন। খাদ্যে ভেজাল ঠেকাতে ১৬ জুলাই ২০২৬ থেকে রাস্তার পিঠা-পিঁয়াজু বিক্রেতাকেও নিরাপদ খাদ্যের নিবন্ধন নিতে হবে। ফি কম, কিন্তু আসল খরচ দপ্তর খোঁজা, এক দিনের বিক্রি বন্ধ রাখা আর পরিদর্শনের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক। (বিস্তারিত: পিঁয়াজু বিক্রেতারও নিবন্ধন লাগবে)

উদাহরণ ৩: লাইসেন্সের পাহাড়। একটি বড় খাদ্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁদের ১৭টি আলাদা দপ্তর থেকে লাইসেন্স ও নিবন্ধন নিতে হয়। বিনিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে প্লাস্টিক বর্জ্য খাতের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৩১টি পর্যন্ত লাইসেন্স আর প্রায় ৬৫০ দিনের কথা এসেছে। প্রতিটি লাইসেন্স কোনো না কোনো ঝুঁকি ঠেকানোর জন্য; সব মিলিয়ে তা সৎ উদ্যোক্তার জন্যই সবচেয়ে বড় বাধা।

সময়ের করের হিসাব

এর সঠিক সরকারি হিসাব নেই, তাই একটা কাল্পনিক হিসাব করি। ধরা যাক, একটা নিয়মের কারণে বছরে ১০ লাখ মানুষকে একবার করে বাড়তি অর্ধেক দিন খরচ করতে হয়। তাহলে বছরে ৫ লাখ কর্মদিবস শুধু প্রমাণ বয়ে বেড়াতে যায়। এর মধ্যে সত্যিকারের প্রতারক যদি হাজারে একজনও হন, তাঁকে ধরতে বাকি ৯৯৯ জনের সময় খরচ হলো। আর বুদ্ধিমান প্রতারক প্রায়ই কাগজ ঠিক রেখেই প্রতারণা করেন।

এই খরচ কোনো বাজেটে দেখা যায় না, কিন্তু প্রতিটি পরিবার আর ছোট ব্যবসা তা টের পায়। আর যেখানে প্রতিটি ধাপে কারও অনুমোদন লাগে, সেখানে ধাপ যত বাড়ে, “দ্রুত করে দেওয়ার” অনানুষ্ঠানিক বাজারও তত বড় হয়।

উল্টো নকশা

  • শুরুতে বিশ্বাস: সরকারের কাছে যে তথ্য আগে থেকেই আছে (রিটার্ন, এনআইডি, টিআইএন), তা নাগরিককে দিয়ে আবার প্রমাণ করানো নয়; দপ্তরগুলো নিজেরাই অনলাইনে মিলিয়ে নিক।
  • নমুনা ধরে যাচাই: সবার আগাম যাচাই না করে ঝুঁকি বুঝে এলোমেলো নমুনা ধরে পরে যাচাই।
  • ধরা পড়লে কঠোর শাস্তি: মিথ্যা ঘোষণা দিলে শাস্তি যেন সত্যিই ভারী হয়, যাতে প্রতারণার ঝুঁকি বেশি হয়।
  • নীরবতা মানে অনুমোদন: নির্দিষ্ট সময়ে দপ্তর জবাব না দিলে আবেদন অনুমোদিত ধরা।

এর কিছু সূচনা অবশ্য দেখা যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ বাজেটে এক জানালায় সাত দিনে লাইসেন্স আর কিছু ক্ষেত্রে জবাব না দিলে অনুমোদিত ধরার প্রস্তাব এসেছে; ৯ আগস্ট ২০২৬ বিনিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা সহজীকরণবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে। এগুলো কাগজ থেকে দপ্তরে নামে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।

কোথায় এই যুক্তি খাটে না

নিজের যুক্তির সীমাও বলা দরকার। কিছু ক্ষেত্রে আগাম যাচাই সত্যিই জরুরি, কারণ পরে ধরলে ক্ষতি আর ফেরানো যায় না:

  • ব্যাংক হিসাব ও বড় লেনদেন: অর্থ পাচার আর প্রতারণা ঠেকাতে গ্রাহক যাচাই দরকার।
  • জমি ও সম্পত্তি হস্তান্তর: জাল দলিলে একবার জমি গেলে তা ফেরাতে বছরের পর বছর লাগে।
  • ওষুধ, শিশুখাদ্য আর ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য: এখানে ভুলের দাম মানুষের জীবন।
  • অস্ত্র, বিস্ফোরক বা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক কাজ।

প্রস্তাবটা তাই সব নিয়ম তুলে দেওয়ার নয়। প্রস্তাব হলো, প্রতিটি নিয়ম বানানোর আগে একটা প্রশ্ন করা: এই নিয়ম কতজন অসৎ মানুষ ধরবে, আর তার জন্য কতজন সৎ মানুষের কত সময় খরচ হবে?

আপনি কী করতে পারেন

  1. কোনো সেবায় বাড়তি কাগজ চাওয়া হলে কোন নিয়মে চাওয়া হচ্ছে, তা লিখিতভাবে জানতে চান। অনেক সময় নিয়মে যা নেই, তা-ও চাওয়া হয়।
  2. অনলাইন সেবা আর বিডার ওয়ান স্টপ সার্ভিস যেখানে আছে, সেখানে তা ব্যবহার করুন; কাগজের পথে ধাপ বেশি।
  3. হয়রানির শিকার হলে সরকারের অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থায় (জিআরএস) লিখিত অভিযোগ দিন।
  4. খসড়া আইন বা বিধি মতামতের জন্য প্রকাশ হলে নিজের অভিজ্ঞতা লিখে পাঠান; নীতিনির্ধারকদের কাছে বাস্তব উদাহরণই সবচেয়ে কার্যকর।

শেষ কথা

যে ব্যবস্থা সবাইকে সন্দেহ করে, সে শেষ পর্যন্ত সৎ মানুষকেই সবচেয়ে বেশি শাস্তি দেয়, কারণ তাঁরাই নিয়ম মানেন। বিশ্বাস দিয়ে শুরু করা আর প্রতারণাকে কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া, এই দুটো একসঙ্গে করা গেলে সময়ের কর অনেকটাই কমে।

তথ্যসূত্র

  1. লজ অব বাংলাদেশ, আয়কর আইন, ২০২৩, ধারা ২৬৪ — লিংক
  2. লজ অব বাংলাদেশ, অর্থ আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৯৬ নং আইন) — লিংক
  3. দ্য ডেইলি স্টার, “All food businesses now need safety registration”, জুলাই ২০২৬ — লিংক
  4. দ্য ডেইলি স্টার, “Can the new taskforce finally cut red tape?”, ১১ আগস্ট ২০২৬ — লিংক
  5. দ্য ডেইলি স্টার, “Businesses may get licences within 7 days under single-window plan”, ১১ জুন ২০২৬ — লিংক

এই লেখা মতামত ও সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। সময়ের হিসাবটি উদাহরণ হিসেবে কাল্পনিক। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।