ভিড়ে দাঁড়িয়ে ভিডিও করছিলেন? আইন বলছে আপনিও ভিড়ের অংশ
|

ভিড়ে দাঁড়িয়ে ভিডিও করছিলেন? আইন বলছে আপনিও ভিড়ের অংশ

শুধু দাঁড়িয়ে থাকলেই কেউ গণপিটুনির মামলার আসামি হয়ে যান না। কিন্তু “মার, মার” বলে উসকে দিলে, ভিড়ে জেনেবুঝে থেকে গেলে বা আক্রান্ত মানুষটিকে পালাতে না দিলে দণ্ডবিধি আপনাকে ভিড়ের সদস্য, এমনকি হত্যার সহযোগী হিসেবে দেখতে পারে। আর কারও খুন হতে দেখে পুলিশকে না জানানোও আইনের চোখে নির্দোষ নীরবতা নয়।

শিরোনামটা একটু কড়া। তবে যতটা মনে হয়, ততটা নয়।

গণপিটুনির প্রায় প্রতিটি ভিডিওতে একটা দৃশ্য থাকে। মাঝখানে একজন মানুষ মাটিতে পড়ে আছেন। চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আরও কয়েকজন, যাঁদের হাতে লাঠি নেই, আছে মোবাইল ফোন। পরে তাঁদের অনেকের একটাই কথা, “সবাই মারছিল, আমি তো শুধু ভিডিও করছিলাম।” এই “শুধু” শব্দটা আইনের কাছে কতটা টেকে, সেটাই আজকের আলোচনা।

মূল কথা

  • ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে গণপিটুনিতে নিহত ১৩৩ জন, আগের বছরের একই সময়ের প্রায় দ্বিগুণ (এইচআরএসএস)।
  • জেনেবুঝে ভিড়ে থাকলে ১৪৯ ধারায় ভিড়ের অপরাধের দায় সবার ঘাড়ে পড়তে পারে।
  • উসকানি দেওয়া ব্যক্তি ঘটনাস্থলে থাকলে ১১৪ ধারায় তাঁকে অপরাধকারী হিসেবেই গণ্য করা হয়।
  • খুন বা দাঙ্গা দেখলে পুলিশকে জানানো ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৪ ধারায় নাগরিকের আইনি দায়িত্ব।

গণপিটুনিতে এ বছর কত মানুষ মারা গেছেন?

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনে ২৬১টি গণপিটুনির ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে ঘটনা ছিল ১৪১টি, নিহত ৬৭ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে একই ছয় মাসে পিটিয়ে মারা হয়েছে ১১৩ জনকে। দুই সংগঠনের পদ্ধতি আলাদা, তাই সংখ্যাও আলাদা। তবে কোনো হিসাবেই ছবিটা স্বস্তির নয়। আসকের হিসাবে পুরো ২০২৫ সালে গণপিটুনিতে মারা গিয়েছিলেন ১৯৭ জন।

কারণের তালিকাও পুরোনো। চুরির সন্দেহ, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, স্থানীয় বিরোধ। সর্বশেষ বড় খবরগুলোর একটি ১ সেপ্টেম্বরের। বগুড়া সদর উপজেলায় চুরির সন্দেহে ২৯ বছরের এক যুবককে পিটিয়ে মারা হয়। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে এবং জড়িতদের নাম পেয়েছে। থানার ওসি বলেছেন, পরিবার অভিযোগ দিলে তথ্য যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি তদন্তাধীন, তাই কে দোষী সে বিষয়ে এখানে কোনো মত দিচ্ছি না।

ভিডিও করলেই কি আমি আসামি?

না, শুধু উপস্থিতি যথেষ্ট নয়। দণ্ডবিধির ১৪১ ধারায় পাঁচ বা ততোধিক মানুষের জমায়েত বেআইনি সমাবেশ (unlawful assembly), যদি তাদের সাধারণ উদ্দেশ্য হয় কোনো অপরাধ করা। একটা নিরীহ জটলাও পরে বেআইনি সমাবেশ হয়ে যেতে পারে, ধারাটির ব্যাখ্যাতেই সে কথা আছে। ১৪২ ধারা বলে, ঘটনাগুলো জেনেও যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সেই সমাবেশে যোগ দেন বা তাতে থেকে যান (continues in it), তিনি সমাবেশের সদস্য।

এই “থেকে যাওয়া” শব্দটাই সমস্যা। যখন স্পষ্ট যে একজন মানুষকে মারা হচ্ছে, তখনো বৃত্ত ছোট করে সামনে এগিয়ে ভালো অ্যাঙ্গেল খোঁজা, আর বৃত্ত ভেঙে সরে যাওয়া, আইনের চোখে দুটো আলাদা আচরণ। প্রথমটায় আপনি ভিড়ের দেয়ালের একটা ইট। আক্রান্ত মানুষটি সেই দেয়ালের জন্যই পালাতে পারেন না।

সদস্য হলে দায় কতদূর যায়, সেটা বলে ১৪৯ ধারা। সমাবেশের সাধারণ উদ্দেশ্য পূরণে কোনো সদস্য অপরাধ করলে, সেই মুহূর্তে যিনি সদস্য ছিলেন তিনিও সেই অপরাধে দোষী। অর্থাৎ একজন লাঠি চালালেন, মানুষটি মারা গেলেন, আর ভিড়ের সদস্য প্রমাণিত প্রত্যেকে হত্যার অভিযোগের মুখে পড়তে পারেন। হত্যার শাস্তি ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন। শুধু বেআইনি সমাবেশের সদস্য হওয়ার শাস্তিই ১৪৩ ধারায় ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড।

কয়েকজন আগে থেকে পরিকল্পনা করে মারলে আছে ৩৪ ধারা (সাধারণ অভিপ্রায়, common intention)। তখন প্রত্যেকে এমনভাবে দায়ী, যেন কাজটা তিনি একাই করেছেন।

“মার, মার” বললে কী হয়?

তখন আপনি আর দর্শক থাকেন না। দণ্ডবিধির ১০৭ ধারায় কাউকে কোনো কাজে প্ররোচিত (instigate) করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে সাহায্য করা হলো অপরাধে সহায়তা (abetment)। আর ১১৪ ধারা বলে, সহায়তাকারী যদি অপরাধ ঘটার সময় সেখানে উপস্থিত থাকেন, তবে ধরা হবে তিনি নিজেই অপরাধটা করেছেন।

ভিডিওর ভেতরে থাকা একটা চিৎকার, “আরও দে”, তাই আদালতে প্রমাণ হিসেবে উঠতে পারে। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, সেই প্রমাণ অনেক সময় রেকর্ড হয় উসকানিদাতার নিজের ফোনেই। লাইভ ভিডিও, কমেন্ট আর শেয়ারের ইতিহাসও তদন্তে কাজে লাগতে পারে। মোবাইল ফোন সাক্ষী হিসেবে খুব বিশ্বস্ত, সে কারও পক্ষ নেয় না।

খুন হতে দেখে চুপ থাকা কি অপরাধ?

অনেকে জানেন না, কিছু অপরাধের খবর পুলিশকে জানানো আইনি দায়িত্ব। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৪ ধারা অনুযায়ী দণ্ডবিধির ৩০২ (খুন), ৩০৪ (খুন নয় এমন অপরাধজনক প্রাণনাশ), ১৪৩, ১৪৭ (দাঙ্গা)সহ তালিকাভুক্ত অপরাধ ঘটতে দেখলে যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া অবিলম্বে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। কারণটা যুক্তিসংগত ছিল কি না, সেটা প্রমাণের দায় যিনি জানাননি তাঁর।

আইনত বাধ্য হয়েও ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য না দিলে দণ্ডবিধির ২০২ ধারায় ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা হতে পারে। বাস্তবে এই ধারায় দর্শকের বিরুদ্ধে মামলা খুব একটা হয় না, সেটা সত্যি। তবে আইনের অবস্থান পরিষ্কার। লম্বা ভিডিও করার সময় ছিল, অথচ ৯৯৯-এ একটা কল করার দশ সেকেন্ড ছিল না, এই যুক্তি আদালতে দুর্বল শোনাবে।

মানুষ কেন গণপিটুনিতে যোগ দেয়?

সৎ উত্তরটা অস্বস্তিকর। অনেকে বিশ্বাস করেন, চোরকে পুলিশে দিলে কিছুই হবে না। ১২ এপ্রিল ২০২৬ প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, একই ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বারবার হামলা করছে এবং এটা অভ্যাসগত অপরাধে পরিণত হচ্ছে। তাঁর হিসাবে আদর্শ অনুপাত যেখানে প্রতি ২০০ জনে একজন পুলিশ, সেখানে এখন একজন পুলিশের দায়িত্বে প্রায় ৮০০ মানুষ।

সরকারের অবস্থানও তাদের নিজেদের ভাষায় দেখা দরকার। ১০ মে ২০২৬ পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনের মধ্যেই যতটা সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তবে প্রয়োজন হলে আইন সংশোধন করা হবে, কারণ বিদ্যমান আইন একা যথেষ্ট নয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত গণপিটুনি নিয়ে আলাদা কোনো আইনের খসড়া প্রকাশ্যে আসেনি।

আরেকটা কারণ গুজব। “ছেলেধরা”, “চোর”, “অবমাননাকারী”, এই শব্দগুলো ভিড়ের কাছে বিচার শেষ হওয়ার ঘোষণা। কোনো একটি সম্প্রদায় বা বিশ্বাস গণপিটুনির জন্য দায়ী নয়। দায়ী সেই মুহূর্ত, যখন যাচাই না করা একটা অভিযোগ কয়েক মিনিটেই রায়ে পরিণত হয়। আর যিনি প্রথম চিৎকারটা দেন, প্রায়ই তাঁকে পরে খুঁজে পাওয়া যায় না। যাচাই ছাড়া অভিযোগ মুখে মুখে বা ফেসবুকে ছড়ানোর আইনি ঝুঁকি নিয়ে আলাদা করে লিখেছি: গুজব কী, ঠিক করবে কে?

ঘটনাস্থলে থাকলে নিরাপদে কী করতে পারি?

বীরত্ব দেখাতে গিয়ে নিজে আক্রান্ত হওয়ার দরকার নেই। নিচের কাজগুলো বেশির ভাগ মানুষ ঝুঁকি ছাড়াই করতে পারেন।

  1. প্রথমেই ৯৯৯-এ কল করুন। নির্দিষ্ট জায়গা আর চেনা কোনো ল্যান্ডমার্ক বলুন। কেউ কল করেছে ধরে নেবেন না, ভিড়ে সবাই এটাই ভাবে।
  2. একা ঝাঁপিয়ে পড়বেন না। পরিচিত দু-তিনজন মিলে জোরে বলুন, “পুলিশ আসছে, পুলিশে দিন।” ভিড়কে একটা আইনি বিকল্প দেখালে অনেকেই হাত গুটিয়ে নেন।
  3. সুযোগ পেলে আক্রান্ত মানুষটিকে কাছের দোকান বা অফিসঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করুন, তারপর হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
  4. ভিডিও যদি করেন, প্রমাণের জন্য করুন। দূর থেকে, হামলাকারীদের মুখ, সময় আর জায়গা যেন বোঝা যায়। উসকানির আওয়াজ দেবেন না।
  5. ভিডিওটা ফেসবুকে না দিয়ে পুলিশ বা তদন্ত কর্মকর্তাকে দিন। নিহত মানুষের শেষ মুহূর্ত ভাইরাল করা প্রমাণ নয়, অসম্মান।
  6. যাচাই না করা “চোর ধরা পড়েছে” বা “ছেলেধরা” পোস্ট শেয়ার করবেন না।
  7. পরে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিতে রাজি থাকুন। সাক্ষী না পেলে বহু মামলা এখানেই থেমে যায়।

শেষ কথা: বিচার দ্রুত না হলে ভিড় আবার আদালত বসাবে

আইনে ঘাটতি আছে কি না, সেই বিতর্ক চলুক। কিন্তু দণ্ডবিধিতে ১৪৯, ১১৪ আর ৩০২ ধারা দেড়শো বছরের বেশি সময় ধরে আছে। সমস্যা হলো, প্রয়োগ এতটা ধীর যে ভিড় ধরে নেয় কিছু হবে না। আর যিনি ভিডিও করছেন, তিনি ধরে নেন তাঁর তো কিছুই হবে না।

আমার প্রস্তাব, নতুন আইনের অপেক্ষা না করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র দিক। এক, গণপিটুনিতে মৃত্যু হলে পরিবারের অভিযোগের অপেক্ষা না করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ নিজেই এজাহার করবে। খুন আমলযোগ্য অপরাধ, পুলিশের সেই ক্ষমতা আছে। দুই, প্রতিটি জেলায় গণপিটুনির মামলার তালিকা, তদন্তের অবস্থা আর চার্জশিটের তারিখ প্রতি তিন মাসে প্রকাশ করা হবে। তিন, নিহতের পরিবারকে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণের একটা নির্দিষ্ট তহবিল হবে, যা পরে দোষী প্রমাণিতদের কাছ থেকে আদায় করা যাবে। যেদিন ভিড়ের মানুষ জানবে যে ভিডিওটা শেষ পর্যন্ত আদালতে যাবে, সেদিন অনেক হাত মোবাইলের বদলে ৯৯৯ ডায়াল করবে।

তথ্যসূত্র

  1. দ্য ডেইলি স্টার, “Rights violations, abuses surge in first half of 2026” (এইচআরএসএসের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন), ১৬ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  2. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Pervasive violence mostly against women, children marks first half of 2026: ASK”, ৬ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  3. দ্য ডেইলি স্টার, “Man beaten to death on suspicion of theft in Bogura”, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
  4. প্রথম আলো (ইংরেজি), “Mob violence reemerges as perpetrators not brought to justice”, ১২ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক
  5. দ্য ডেইলি স্টার, “Govt to amend laws if needed to curb mob violence: Home minister”, ১০ মে ২০২৬ — লিংক
  6. লজ অব বাংলাদেশ, দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (ধারা ৩৪, ১০৭, ১১৪, ১৪১, ১৪২, ১৪৩, ১৪৯, ২০২, ৩০২) — লিংক
  7. লজ অব বাংলাদেশ, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮, ধারা ৪৪ — লিংক

হালনাগাদ, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: সেপ্টেম্বরে গণপিটুনি নিয়ে নতুন কোনো আইন, খসড়া বা সরকারি পরিপত্র প্রকাশিত হয়নি। তাই এখনো দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধির প্রচলিত বিধানগুলোই প্রযোজ্য।

এই লেখা সাধারণ আইনি ও নীতিগত তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।