নামজারি এখন ২৮ দিনের অধিকার। ২৯তম দিনে কী হবে?
|

নামজারি ২৮ দিনে হওয়ার কথা। না হলে কী করবেন?

জমি কিনলেন, দলিল রেজিস্ট্রি হলো, টাকাও মিটিয়ে দিলেন। অনেকে ভাবেন কাজ শেষ। আসলে অর্ধেক বাকি। সরকারি খতিয়ানে আপনার নাম না ওঠা পর্যন্ত রেকর্ডে জমিটা আগের মালিকের নামেই থাকে। নাম তোলার এই কাজটাই নামজারি, বা মিউটেশন।

জমি নিয়ে অনেক ঝামেলার জন্ম এই ফাঁক থেকে। আগের মালিক একই জমি আবার বিক্রি করেন, ওয়ারিশদের কেউ আপত্তি তোলেন, ভূমি উন্নয়ন কর দিতে গিয়ে দেখা যায় হোল্ডিং অন্যের নামে। তাই নামজারি ফেলে রাখার জিনিস নয়।

ভালো খবর হলো, নামজারি এখন অনলাইনে হয়, আর এর একটা নির্ধারিত সময়সীমা আছে: সাধারণ আবেদনে ২৮ দিন। কিন্তু ২৮ দিনে না হলে কী করবেন, সেটা বেশির ভাগ মানুষ জানেন না। এই লেখা সেই প্রশ্ন নিয়ে।

মূল কথা

  • সাধারণ নামজারি আবেদন নিষ্পত্তির নির্ধারিত সময় ২৮ দিন; প্রবাসী, মুক্তিযোদ্ধা ও কিছু শিল্প-আবেদনে আরও কম।
  • মোট সরকারি ফি ১,১৭০ টাকা: আবেদনের সময় ৭০ টাকা, মঞ্জুর হলে ডিসিআর ফি ১,১০০ টাকা।
  • সময় পার হলেও আবেদন আপনাআপনি মঞ্জুর হয় না। লিখিত তাগিদ, ১৬১২২ হেল্পলাইন আর ঊর্ধ্বতন দপ্তরে অভিযোগই পথ।
  • আবেদন নামঞ্জুর হলে সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল করা যায়।

নিয়মটা কী বলছে

ই-নামজারিতে সাধারণ আবেদন নিষ্পত্তির জন্য ২৮ দিন সময় ধরা আছে। প্রথম আলোর ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২-এর প্রতিবেদনেই এই সময়সীমার কথা আছে। প্রবাসীদের জন্য সময় আরও কম: মেট্রো এলাকায় ১২ কার্যদিবস, অন্যত্র ৯ কার্যদিবস। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ১০ কার্যদিবস, রপ্তানিমুখী বা বিদেশি বিনিয়োগের শিল্পের জন্য ৭ কার্যদিবস।

একই প্রতিবেদনে আরেকটা তথ্য ছিল, যেটা মনে রাখার মতো। ২৮ দিনের জায়গায় তখন গড়ে লাগছিল ৪৩ দিন, কোনো কোনো জেলায় আরও অনেক বেশি। অর্থাৎ সময়সীমা আছে, কিন্তু সব অফিস তা মানতে পারছে না।

আবেদন করা যায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন সিস্টেমে (mutation.land.gov.bd), ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে, অথবা উপজেলা বা সার্কেল ভূমি অফিসে গিয়ে। দলিল, আগের খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদসহ দরকারি কাগজ স্ক্যান করে আপলোড করতে হয়। আবেদনের অগ্রগতি এসএমএসে জানানো হয়।

খরচ কত

সরকারি ফি মোট ১,১৭০ টাকা, দুই ধাপে:

  • আবেদনের সময়: কোর্ট ফি ২০ টাকা + নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা = ৭০ টাকা।
  • আবেদন মঞ্জুর হলে: রেকর্ড সংশোধন ফি ১,০০০ টাকা + খতিয়ান সরবরাহ ফি ১০০ টাকা = ১,১০০ টাকা। একেই ডিসিআর ফি বলে।

ডিসিআর ফি দেওয়ার সময় হলে এসএমএস আসে, আর অনলাইনেই পরিশোধ করা যায়। কিউআর কোডসহ অনলাইন ডিসিআর আইনগতভাবে বৈধ। এর বাইরে কেউ “ফাইল চালানোর খরচ” চাইলে সেটা সরকারি ফি নয়। রসিদ ছাড়া কাউকে কোনো টাকা দেবেন না।

২৮ দিন পার হলে আসল সমস্যা

আমার মতে নামজারির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা এটাই। সময়সীমা আছে, কিন্তু সময় পার হলে কী হবে, তা বলা নেই। আবেদন আপনাআপনি মঞ্জুর হয় না, কোনো ক্ষতিপূরণ নেই, দেরির কারণ আবেদনকারীকে লিখিতভাবে জানানোর বাধ্যবাধকতাও নেই।

আপিলের পথও এখানে কাজে আসে না। আপিল হয় একটা আদেশের বিরুদ্ধে, যেমন আবেদন নামঞ্জুর হলে। ফাইল যদি কোনো আদেশ ছাড়াই পড়ে থাকে, তাহলে আপিল করার মতো আদেশই নেই। ফলে দেরির পুরো ভার পড়ে আবেদনকারীর ঘাড়ে।

তবু হাত গুটিয়ে বসে থাকার কারণ নেই। নিচের ধাপগুলো ধীরে কাজ করে, কিন্তু কাজ করে।

২৯তম দিনে যা করবেন

  1. অনলাইনে আবেদনের অবস্থা দেখুন, তারিখসহ স্ক্রিনশট রাখুন। দেরির প্রমাণ এটাই।
  2. কোনো কাগজের ঘাটতির কথা জানানো হলে দেরি না করে জমা দিন। ঘাটতি পূরণের সময় সীমিত, আর ঘাটতির কারণে নামঞ্জুর হলে পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে হতে পারে।
  3. সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন নম্বর উল্লেখ করে লিখিত তাগিদপত্র দিন। রিসিভ কপি রাখুন; মুখের তাগিদের কোনো রেকর্ড থাকে না।
  4. ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২-এ ফোন করে অভিযোগ দিন, অভিযোগ নম্বর লিখে রাখুন।
  5. তাতেও না হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিন। সরকারের অনলাইন অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাও (জিআরএস) ব্যবহার করা যায়। আগের সব কাগজ সংযুক্ত করুন।
  6. মাসের পর মাস কোনো আদেশ না হলে, আর আপনার কাগজপত্র ঠিক থাকলে, হাইকোর্ট বিভাগে রিট করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার নির্দেশ চাওয়ার সুযোগ আছে। এটা শেষ ধাপ, খরচও আছে। তাই আগে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।

আবেদন নামঞ্জুর হলে

নামঞ্জুরের আদেশ পেলে আপিলের পথ খোলে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৭ ধারা অনুযায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর আদেশের বিরুদ্ধে আপিল যায় কালেক্টরের কাছে; মাঠপর্যায়ে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)। সাধারণত আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। এরপরের ধাপ অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব), আর সর্বশেষ ভূমি আপিল বোর্ড।

এখানে দিন গোনা খুব জরুরি। মেয়াদ পার হলে ঠিক যুক্তিও অনেক সময় কাজে আসে না। আদেশের কপি হাতে পেলেই তারিখটা লিখে রাখুন, আর দেরি না করে পরামর্শ নিন।

নামজারিতে কি আয়কর রিটার্নের প্রমাণ লাগবে?

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাব এসেছিল, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাটের নামজারি ও বণ্টনে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ (পিএসআর) লাগবে। কিন্তু ৩০ জুন ২০২৬ প্রকাশিত অর্থ আইন, ২০২৬-এ আয়কর আইনের ২৬৪ ধারায় যে সংশোধনী এসেছে, তাতে নামজারির উল্লেখ নেই। অর্থাৎ আইনের পাঠ অনুযায়ী নামজারিতে পিএসআর এখনো বাধ্যতামূলক নয়।

তবে একটা জিনিস আগে থেকেই আছে: ওই শহর এলাকাগুলোতে জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের বিক্রয়, হস্তান্তর, বায়নানামা বা আমমোক্তারনামা নিবন্ধন করতে পিএসআর লাগে (আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৪)। প্রস্তাবটা ভবিষ্যতে আবার আসতে পারে; তখন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি বা করমুক্ত সীমার নিচের আয়ের মানুষের বিষয়টা পরিষ্কার করা দরকার হবে। কোনো ভূমি অফিস পিএসআর চাইলে কোন নির্দেশনায় চাইছে, তা লিখিতভাবে জেনে নিন।

যা বদলালে সবার উপকার হতো

প্রশাসনের যুক্তিও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। সময় পার হলেই আবেদন মঞ্জুর ধরে নিলে জাল দলিলের দরজা খুলে যাবে। কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিপূরণের দায়ে ফেললে অনেকে সিদ্ধান্ত নেওয়াই এড়িয়ে যাবেন, আর ফাইল আরও জমবে।

তাই আমার প্রস্তাব ছোট, দুটো:

  • ২৮ দিনে নিষ্পত্তি না হলে দেরির কারণ আবেদনকারীকে লিখিতভাবে জানানো বাধ্যতামূলক হোক।
  • উপজেলাভিত্তিক গড় নিষ্পত্তির সময় নিয়মিত প্রকাশ করা হোক। সংখ্যা প্রকাশ্যে থাকলে চাপ আপনাআপনি তৈরি হয়।

দুটোই দপ্তরকে অচল না করে জবাবদিহি আনে।

শেষ কথা

জমি কেনার পর দেরি না করে নামজারির আবেদন করুন, কাগজ গুছিয়ে দিন, আর ২৮ দিন পার হলে চুপ করে বসে থাকবেন না। লিখিত তাগিদের রিসিভ কপি আর অভিযোগ নম্বর, এই দুটো কাগজই পরে আপনার সবচেয়ে বড় সহায়। নামজারির কাজে কেউ ঘুষ চাইলে আইনত কী করবেন, তা নিয়ে আলাদা লিখেছি: ১,১৫০ টাকার কাজে ৭০,০০০ টাকা।

তথ্যসূত্র

  1. প্রথম আলো, “নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না ই-নামজারি, লাগছে গড়ে ৪৩ দিন”, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ — লিংক
  2. যুগান্তর, “অনলাইনে যেভাবে করবেন জমির নামজারি, সময় ও খরচের বিস্তারিত”, ১৬ নভেম্বর ২০২৫ — লিংক
  3. প্রথম আলো, “রিটার্ন ছাড়া সঞ্চয়পত্রের করের টাকা ফেরত পাবেন না; জমি–ফ্ল্যাট নামজারি নয়”, ১৯ জুন ২০২৬ — লিংক
  4. বিডিনিউজ২৪, “১৬১২২: ফোনেই মিলবে ভূমির সেবা”, ৬ জানুয়ারি ২০২২ — লিংক
  5. ভূমি মন্ত্রণালয়, মিউটেশন সিস্টেম — লিংক
  6. লজ অব বাংলাদেশ, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০, ধারা ১৪৭ — লিংক
  7. লজ অব বাংলাদেশ, অর্থ আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৯৬ নং আইন) — লিংক
  8. লজ অব বাংলাদেশ, আয়কর আইন, ২০২৩, ধারা ২৬৪ — লিংক

এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। ফি ও সময়সীমা সময়ে সময়ে বদলায়; আবেদনের আগে ভূমি অফিস বা ১৬১২২ থেকে জেনে নিন।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।