এক এজলাসে দুই বিচারক: ৪৬ লাখ মামলার দেশে “শিফটে বিচার”

এক এজলাসে দুই বিচারক: ৪৬ লাখ মামলার দেশে “শিফটে বিচার”

দেশের নিম্ন আদালতের প্রায় প্রতি চারজন বিচারকের একজনের নিজের এজলাস নেই। ডেইলি স্টারের ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত অনুসন্ধান বলছে, অন্তত ৪৮২ জন বিচারক ২৪১টি এজলাস ভাগাভাগি করে বসেন, ৬৪ জেলার ৪০টিতে। ফলে অনেকে দিনে মাত্র তিন-চার ঘণ্টা বিচারকের আসনে বসার সুযোগ পান। আর নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৪০ লাখ ৭৮ হাজারের বেশি।

মামলাজট নিয়ে আলোচনা উঠলেই আমরা আইন সংশোধনের কথা বলি। নতুন ধারা, নতুন সময়সীমা, নতুন অধ্যাদেশ। কিন্তু এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় বার্তাটা হলো, সমস্যার একটা বড় অংশ ইট-সিমেন্ট আর ঘড়ির কাঁটার। আইন যত ভালোই হোক, বিচারক বসার জায়গা না পেলে তা কাগজেই থাকে।

মূল কথা

  • ৪৮২ বিচারক, ২৪১ এজলাস, ৪০ জেলা: দুজন বিচারক, একটি কক্ষ।
  • ঢাকার নমুনায় নিজস্ব এজলাসের বিচারকেরা ৩৭ শতাংশ বেশি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন।
  • ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সব আদালতে বিচারাধীন মামলা ৪৬,৩৯,৪৭৬টি।
  • নতুন ভবন আসার আগেই শিফটের নিয়ম, অস্থায়ী কক্ষ আর ভার্চুয়াল শুনানি দিয়ে সময় বাঁচানো যায়।

“শিফটে বিচার” মানে আসলে কী?

কাগজে আদালতের সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা। বাস্তবে একই কক্ষে দুজন বিচারক পালা করে বসেন, সাধারণত একজন সকালে, আরেকজন দুপুরে। ডেইলি স্টার ২৯ জুলাইয়ের একটি দিনের বিবরণ দিয়েছে। এক বিচারক সকাল সাড়ে ১০টার পর ঘণ্টাখানেক বসে ২০টি মামলা শুনলেন। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সোয়া ৩টা পর্যন্ত একই চেয়ারে বসলেন আরেকজন, তাঁর তালিকায় ৩৬টির বেশি মামলা।

ছয় বছর ধরে এজলাস ভাগ করে কাজ করা এক যুগ্ম জেলা জজ পত্রিকাটিকে বলেছেন, সময় সীমিত বলে সব সময় একটা অদৃশ্য চাপ থাকে, অথচ বিচারপ্রক্রিয়াকে কড়া সময়ে বেঁধে রাখা যায় না। একজন বেঞ্চ সহকারী জানিয়েছেন, নথি রাখার আলাদা জায়গা নেই, হারিয়ে যাওয়ার ভয় সারাক্ষণ।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেছেন, অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে বিচারকেরা শুরু থেকেই পিছিয়ে থাকেন।

এজলাস নিজের হলে কতটা তফাত হয়?

ডেইলি স্টার ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের ১২ জন বিচারকের ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুনের তথ্য মিলিয়েছে। এজলাস ভাগ করা ছয়জন নিষ্পত্তি করেছেন ১,০০০ মামলা। নিজস্ব এজলাসের ছয়জন করেছেন ১,৩৭২টি। অর্থাৎ ৩৭ শতাংশ বেশি। উল্টো দিক থেকে দেখলে, ভাগাভাগির বিচারকেরা প্রায় ২৭ শতাংশ কম।

সৎ থাকার জন্য একটা কথা বলা দরকার। নমুনা মাত্র ১২ জনের, এক আদালতের, ছয় মাসের। মামলার ধরন, জটিলতা, বিচারকের অভিজ্ঞতা সব এক নয়। তাই ৩৭ শতাংশকে সারা দেশের হিসাব ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু দিকটা পরিষ্কার। দুই দলের মধ্যে আইন এক, পদ এক, আদালত এক। বড় পার্থক্য একটা ঘরের। আর তাতেই নিষ্পত্তি বেশি তিন ভাগের এক ভাগেরও বেশি। এত সস্তা সংস্কার বিচার বিভাগে কমই আছে।

বিচারক বাড়ল, এজলাস বাড়ল না কেন?

প্রতিবেদন অনুযায়ী বিচারকের সংখ্যা ২০০৮ সালের ১,২৬১ থেকে ২০২৫ সালে ২,৩০১-এ উঠেছে। এর মধ্যে প্রেষণে থাকা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের বিচারকেরাও আছেন। নিম্ন আদালতে বিচারকাজে আছেন প্রায় ১,৯৬০ জন। নিয়োগ হয়েছে দ্রুত, ভবন হয়েছে ধীরে। সমস্যার শুরু ১৯৯১ সালে উপজেলা পর্যায়ের আদালত বিলুপ্তির পর, যেগুলো চালু হয়েছিল ১৯৮২ সালে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ঘাটতিটা চলছে।

জেলাওয়ারি ঘাটতির তালিকাও আছে। ঢাকায় দরকার আরও ১৭টি এজলাস, খুলনায় ১৩, চট্টগ্রামে ১২, কক্সবাজারে ১১, ফেনীতে ১০। শরীয়তপুরসহ ২৩টি জেলায় এখনো চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নিজস্ব ভবনই নেই।

একজন বিচারপ্রার্থীর দিনটা কেমন যায়?

প্রতিবেদনের একটি উদাহরণ যথেষ্ট। একটি মাদক মামলায় সাক্ষ্য দিতে এক পুলিশ কর্মকর্তা রাজশাহী থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সকাল ৯টায় আদালতে পৌঁছান। ডাক পড়ে দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে। ছয় ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা। সরকারি কর্মকর্তার বেলায় এই ছয় ঘণ্টা রাষ্ট্রের খরচ। একজন দিনমজুর সাক্ষী বা বাদীর বেলায় সেটা এক দিনের মজুরি, যাতায়াতের ভাড়া, আর পরের তারিখে আবার আসার অনিচ্ছা।

ক্ষতিটা শুধু অপেক্ষায় থামে না। এক অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ পত্রিকাটিকে বলেছেন, এজলাসের সময় কম থাকলে আইনজীবীরা প্রায়ই দীর্ঘ জেরা ও যুক্তিতর্ক এড়িয়ে যান। ফলে শুনানি মুলতবি হয়, মামলা লম্বা হয়। চেম্বারে অনেকে জিজ্ঞেস করেন, “এত তারিখ পড়ে কেন?” উত্তরের একটা অংশ হলো, দুপুর ১২টায় চেয়ারটা আরেকজনের।

এটা কি শুধু অফিস-ব্যবস্থাপনার সমস্যা?

না। সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদ ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। দেওয়ানি মামলার বাদী-বিবাদীর বেলায়ও যুক্তিসঙ্গত সময়ে বিচার ন্যায়বিচারেরই অংশ। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান ডেইলি স্টারকে বলেছেন, শুনানি পিছালে বিচারপ্রার্থীর ওপর আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক বোঝা বাড়ে, আর দীর্ঘ বিচার বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমায়।

হাইকোর্ট বিভাগের বিশেষ কর্মকর্তা মো. মাজহারুল হক আরও সরাসরি বলেছেন, দেশজুড়ে এজলাসের ঘাটতি বর্তমান মামলাজটের একটি বড় কারণ। অর্থাৎ কথাটা বাইরের সমালোচকের নয়, বিচার বিভাগের ভেতরের মানুষের। একজন হাজতি আসামির কাছে এর মানে আরও কঠিন। তাঁর মামলার তারিখ পিছালে তিনি বাড়ি ফেরেন না, কারাগারে ফেরেন।

আমরা প্রায়ই বলি “বিচারক কম”। তথ্য বলছে, অন্তত ৪০ জেলায় বিচারক আছেন, বসার জায়গা নেই। নতুন বিচারক নিয়োগ দিয়ে তাঁকে আরেকজনের চেয়ারের পালা ধরিয়ে দিলে জনবল বাড়ে, বিচারের ঘণ্টা বাড়ে না।

৪৬ লাখ মামলার হিসাবটা কী?

আইনমন্ত্রী সংসদে যে তথ্য দিয়েছেন, ডেইলি স্টারের ৭ জুলাই ২০২৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত:

  • মোট বিচারাধীন মামলা ৪৬,৩৯,৪৭৬টি।
  • আপিল বিভাগে ৩৮,৭১৩, হাইকোর্ট বিভাগে ৫,২২,৩৩১।
  • নিম্ন আদালতে ৪০,৭৮,৪৩২টি, যার ১৬,৯০,৪৪৩টি দেওয়ানি ও ২৩,৮৭,৯৮৯টি ফৌজদারি।
  • অধস্তন আদালতে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো দেওয়ানি মামলা ৩,৭৭,৪১৪টি।

একই জবাবে মন্ত্রী জানিয়েছেন, ১০ বা ২০ বছরের বেশি পুরোনো মামলার আলাদা পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। অর্থাৎ সবচেয়ে পুরোনো রোগীদের তালিকাটাই হাসপাতালের খাতায় নেই। অথচ মোট মামলার ৮৮ শতাংশই নিম্ন আদালতে, ঠিক সেখানে যেখানে বিচারক এজলাস খুঁজে বেড়ান।

নতুন ভবনের আগে কী করা যায়?

ভবন লাগবেই। কিন্তু একটা আদালত ভবন বানাতে কয়েক বছর লাগে। ততদিন ৪৮২ জন বিচারকের সময় বাঁচানোর কিছু উপায় এখনই নেওয়া যায়, নতুন আইন ছাড়াই:

  1. শিফটকে আনুষ্ঠানিক করুন। এখন ভাগাভাগিটা চলে বোঝাপড়ায়। সুপ্রিম কোর্ট একটি সার্কুলারে প্রতিটি ভাগাভাগির এজলাসের জন্য নির্দিষ্ট সময়-স্লট ঠিক করে দিক, সপ্তাহ অন্তর সকাল-দুপুর অদলবদলসহ।
  2. কার্যতালিকায় সময় ছাপুন। কজলিস্টে শুধু মামলার ক্রম নয়, আনুমানিক সময় থাকুক। সাক্ষ্যের মামলা দুপুরের শিফটে হলে সাক্ষী সকাল ৯টায় আসবেন না। রাজশাহী থেকে আসা সাক্ষীর অন্তত সকালের অপেক্ষাটা বাঁচবে।
  3. তারিখ আর মুলতবির কাজ এজলাসের বাইরে নিন। আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০-এর ৩ ধারা যেকোনো আদালতকে ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে বিচারকাজ চালানোর ক্ষমতা দিয়েছে, আর ৫ ধারায় আপিল বিভাগ প্র্যাকটিস নির্দেশনা দিতে পারে। শুধু পরবর্তী তারিখ, হাজিরা বা সাধারণ দরখাস্তের শুনানি খাস কামরা থেকে ভিডিওতে হলে এজলাসের ঘণ্টাগুলো সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্কের জন্য খালি হয়।
  4. অস্থায়ী জায়গা খুঁজুন। জেলা পর্যায়ে সরকারি ভবনের অব্যবহৃত কক্ষ বা ভাড়া করা জায়গায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অস্থায়ী এজলাস চালানোর একটা মানসম্মত নির্দেশিকা করা যায়। শুরু হোক ঘাটতির শীর্ষ পাঁচ জেলা দিয়ে।
  5. ঘাটতির তালিকা ধরে বাজেট দিন। জেলাওয়ারি এজলাস-ঘাটতি প্রতি বছর প্রকাশ করা হোক এবং উন্নয়ন বাজেটে ভবন প্রকল্পের অগ্রাধিকার সেই তালিকা মেনে ঠিক হোক। প্রথম সারিতে থাকুক চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনহীন ২৩ জেলা।

বিচার বিভাগের নিজস্ব সচিবালয় বা মামলার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার মতো বড় সংস্কারের আলোচনা চলছে, চলুক। কিন্তু সেগুলোর সুফলও শেষ পর্যন্ত একজন বিচারকের বসার জায়গা আর সময়ের ওপর নির্ভর করবে।

বিচারপ্রার্থী হিসেবে আপনি কী করতে পারেন

ব্যবস্থা বদলাতে সময় লাগবে। ততদিন নিজের দিনটা বাঁচাতে কয়েকটা কাজ করতে পারেন:

  1. আগের দিন খোঁজ নিন। আইনজীবীর কাছে জেনে নিন আপনার আদালত সকালের না দুপুরের পালায় বসে, আর কার্যতালিকায় মামলাটা কত নম্বরে। দুপুরের পালা হলে সকাল ৯টায় গিয়ে বসে থাকার দরকার নেই।
  2. হাজিরার প্রমাণ নিশ্চিত করুন। আপনি হাজির ছিলেন, সেটা আদেশে বা হাজিরা খাতায় উঠেছে কি না আইনজীবীর মাধ্যমে দেখে নিন। পরে এটাই কাজে লাগে।
  3. বারবার মুলতবির খরচ চান। দেওয়ানি মামলায় অন্য পক্ষের কারণে শুনানি পিছালে আদালত সেই পক্ষকে খরচ দিতে আদেশ দিতে পারেন (দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ১৭)। আইনজীবীকে বিষয়টা তুলতে বলুন।
  4. হাজতে থাকলে বিলম্বের কথা তুলুন। দীর্ঘদিন সাক্ষ্য না হলে জামিনের আবেদনে বিচারে দেরির বিষয়টা স্পষ্ট করে বলা যায়।

সোজা কথা

আমরা বিচার বিভাগের কাছে দ্রুত বিচার চাই, আবার তাঁদের দিনে তিন ঘণ্টার চেয়ার দিই। এটা অনেকটা একজন সার্জনকে অর্ধেক দিন অপারেশন থিয়েটার দিয়ে অপেক্ষমাণ রোগীর তালিকা নিয়ে প্রশ্ন করার মতো। প্রথম পদক্ষেপটা খরচহীন। সুপ্রিম কোর্ট আগামী তিন মাসের মধ্যে ঢাকার ভাগাভাগির এজলাসগুলোতে সময়-স্লটসহ কার্যতালিকা আর ভার্চুয়াল তারিখ-শুনানির প্র্যাকটিস নির্দেশনা চালু করুক। ছয় মাস পর ডেইলি স্টারের মতোই নিষ্পত্তির হিসাব প্রকাশ করুক, আগে-পরে মিলিয়ে। ফল ভালো হলে বাকি ৩৯ জেলায় ছড়িয়ে দিক।

তথ্যসূত্র

  1. দ্য ডেইলি স্টার, “Justice in shifts” (Emrul Hasan Bappi ও Ashutosh Sarkar), ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক
  2. দ্য ডেইলি স্টার, “Over 46 lakh cases pending across courts in Bangladesh: Law minister”, ৭ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  3. বাংলাদেশ আইন ওয়েবসাইট, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৩৫ — লিংক
  4. বাংলাদেশ আইন ওয়েবসাইট, আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০ (২০২০ সনের ১১ নং আইন) — লিংক
  5. দ্য ডেইলি স্টার (সম্পাদকীয়), “Space deficit mustn’t drive case backlogs”, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — লিংক

হালনাগাদ, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬: বিচারপ্রার্থীদের জন্য করণীয় অংশ যোগ; একটি সূত্র যোগ।

এই লেখা সাধারণ আইনি ও নীতিগত তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।