বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে ঢোকার আগে যে পাঁচটা জিনিস দেখে

বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে আসার আগে যে পাঁচটা জিনিস দেখেন

বিনিয়োগ সম্মেলনে সাধারণত বলা হয় সস্তা শ্রম, বড় বাজার আর ভৌগোলিক সুবিধার কথা। এগুলো সত্যি। কিন্তু একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন সত্যিই টাকা আনার সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর আইনজীবী আর হিসাববিদ অন্য কয়েকটা প্রশ্ন নিয়ে বসেন। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ঠিক করে টাকা আসবে কি না।

এই লেখা প্রচারের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বিনিয়োগকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে। দেশীয় উদ্যোক্তা যাঁরা বিদেশি অংশীদার খুঁজছেন, তাঁদের জন্যও এটা কাজের: অংশীদার কোন প্রশ্ন করবেন, আগে থেকে জানা থাকলে আলোচনা সহজ হয়।

মূল কথা

  • বৈদেশিক ব্যক্তিগত বিনিয়োগ (উন্নয়ন ও সংরক্ষণ) আইন, ১৯৮০ মূলধন, মুনাফা আর অবসায়নের অর্থ ফেরত পাঠানোর নিশ্চয়তা দেয় (ধারা ৮), আর ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্তকরণ নিষেধ করে (ধারা ৭)।
  • ৮ মার্চ ২০২৬ বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলারে শেয়ার বিক্রির অর্থ ফেরত পাঠাতে ব্যাংক নিজেই ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদন দিতে পারে; আগে সীমা ছিল ১০ কোটি।
  • বিরোধ নিষ্পত্তিই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা: ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে বিচারাধীন মামলা ৪৬ লাখের বেশি।
  • ২০২৫ সালে নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়ে ১৭৭ কোটি ডলার হলেও নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ দুর্বল।

১. মুনাফা দেশে ফেরানো যাবে তো?

বিনিয়োগকারীর প্রথম প্রশ্ন এটাই। আইনের উত্তর ইতিবাচক: ১৯৮০ সালের আইনের ৮ ধারা মূলধন, মুনাফা আর অবসায়নের অর্থ ফেরত পাঠানোর নিশ্চয়তা দেয়, যদিও ব্যতিক্রমী আর্থিক সংকটে সীমা আরোপের সুযোগও রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মে লভ্যাংশ পাঠাতে আগাম অনুমোদন লাগে না; অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকই কাজটা করে।

বাস্তবের অভিজ্ঞতা অবশ্য মিশ্র। ২০২২–২৪ সালের ডলার সংকটে অনেক বিদেশি কোম্পানির লভ্যাংশ আর বিদেশি এয়ারলাইনসের আয় দেশে আটকে ছিল। পরে বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ায় চাপ কমেছে। রয়্যালটি ও কারিগরি ফি পাঠানোর ক্ষেত্রে এখনো সীমা আছে; জুলাই ২০২৬-এ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানের জন্য সেই সীমা শিথিল করা হয়েছে।

২. বিরোধ হলে কত দিনে মিটবে?

এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। আইনমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে বিচারাধীন মামলা ৪৬ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি; পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো দেওয়ানি মামলা তিন লাখ ৭৭ হাজারের বেশি। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ডুয়িং বিজনেস হিসাবে চুক্তি বলবৎ করতে লাগত প্রায় ১,৪৪২ দিন।

ভালো দিকও আছে। বাংলাদেশ ১৯৯২ সালে বিদেশি সালিসি রায় স্বীকৃতির নিউইয়র্ক কনভেনশনে যোগ দিয়েছে; সালিস আইন, ২০০১-এর ৪৫ ধারায় বিদেশি সালিসি রায় আদালতের ডিক্রির মতো কার্যকর করা যায়। ২০২৬ সালে বাণিজ্যিক আদালত আইন হয়েছে, ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত গঠিত হয়েছে। তবে আইনমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, বাণিজ্যিক আদালত আইন আর সালিস আইন দুটোতেই সংশোধন দরকার।

৩. জমি আর ইজারা কতটা নিশ্চিত?

বিদেশি বিনিয়োগকারী সাধারণত বাংলাদেশে নিবন্ধিত স্থানীয় কোম্পানির মাধ্যমে জমি কেনেন বা ইজারা নেন। সমস্যা মালিকানার নিশ্চয়তায়: পুরোনো রেকর্ড, একাধিক দাবিদার, আর দীর্ঘ জমি-মামলা। এই কারণেই অনেকে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা বা অর্থনৈতিক অঞ্চলে যান, যেখানে বেপজা বা বেজা সরাসরি প্লট ইজারা দেয়। বেপজায় জমির প্লট সাধারণত ৩০ বছরের নবায়নযোগ্য ইজারায় দেওয়া হয়, শতভাগ বিদেশি মালিকানাও অনুমোদিত।

৪. নিয়ম হঠাৎ বদলাবে না তো?

বিনিয়োগকারী দশ-পনেরো বছরের হিসাব করে আসেন। তাই কর বা প্রণোদনার নিয়ম হঠাৎ বদলালে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি হয়। উদাহরণ হিসেবে ২০২৪ সালে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কের কর অব্যাহতি হঠাৎ প্রত্যাহারের সমালোচনা করেছিল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন। ২০২৬-২৭ বাজেটে কর্পোরেট করহার অপরিবর্তিত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি কর-রোডম্যাপ না থাকার কথাও তারা তুলেছে।

আইনি সুরক্ষার দিক থেকে ১৯৮০ সালের আইন ন্যায্য আচরণ আর রাষ্ট্রায়ত্তকরণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়; বাংলাদেশের ৩০টির বেশি দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তিও আছে, যার বড় অংশ কার্যকর।

৫. বেরোতে চাইলে পথ কী?

ঢোকার আগেই বিনিয়োগকারী জানতে চান, বেরোনো কতটা সহজ। এখানে ২০২৬ সালে বড় উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ মার্চ ২০২৬-এর সার্কুলার অনুযায়ী তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির শেয়ার বা সম্পদ বিক্রির অর্থ ফেরত পাঠাতে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক নিজেই ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদন দিতে পারে। ১ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনে স্বাধীন মূল্যায়ন লাগে না, এর বেশি হলে অনুমোদিত মূল্যায়নকারীর ন্যায্যমূল্য লাগে; আর বিক্রয়মূল্য সর্বশেষ নিরীক্ষিত হিসাবের নিট সম্পদমূল্যের বেশি না হলে ১০০ কোটির সীমাও প্রযোজ্য নয়। অনুমোদনের পর অর্থ পাঠাতে হবে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে।

তবে কোম্পানি গুটিয়ে ফেলা এখনো কঠিন ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া; দেউলিয়া ও অবসায়নের ব্যবস্থা দুর্বল।

আমি হলে কোনটা আগে ঠিক করতাম

পাঁচটার মধ্যে আমি বিরোধ নিষ্পত্তিকে আগে রাখব। কারণ অন্য চারটার সমাধানও শেষ পর্যন্ত এর ওপর নির্ভর করে: মুনাফা আটকালে, জমি নিয়ে বিরোধ হলে বা অংশীদার চুক্তি ভাঙলে, বিনিয়োগকারী কত দিনে ন্যায্য সিদ্ধান্ত পাবেন, সেটাই আসল প্রশ্ন। মুনাফা ও শেয়ার বিক্রির নিয়ম ২০২৬ সালে সহজ হয়েছে; বাণিজ্যিক আদালত আর সালিসের ব্যবস্থা কার্যকর হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীর আস্থা সবচেয়ে বেশি বাড়বে।

দেশীয় উদ্যোক্তা যাঁরা বিদেশি অংশীদার আনছেন, তাঁদের জন্য

  1. বিদেশি শেয়ারের টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে এনে এনক্যাশমেন্ট সার্টিফিকেট রাখুন; পরে লভ্যাংশ বা শেয়ার বিক্রির অর্থ পাঠাতে এটাই ভিত্তি।
  2. যৌথ উদ্যোগ চুক্তিতে সালিসের ধারা স্পষ্ট করুন: কোন প্রতিষ্ঠান, কোন শহর, কোন ভাষা, কোন আইন।
  3. বেরোনোর শর্ত আগেই লিখুন: কেউ বেরোতে চাইলে শেয়ারের দাম কীভাবে ঠিক হবে, অন্যরা আগে কেনার সুযোগ পাবেন কি না।
  4. জমি নিলে মালিকানার পূর্ণ যাচাই করুন, অথবা বেপজা বা বেজার ইজারা বিবেচনা করুন।
  5. কর প্রণোদনা নিয়ে পরিকল্পনা করলে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন আর তার মেয়াদ লিখিতভাবে সংগ্রহ করুন।

শেষ কথা

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ কম; প্রশ্ন নিশ্চয়তা নিয়ে। ২০২৫ সালে নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়ে ১৭৭ কোটি ডলার হয়েছে, কিন্তু নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ এখনো দুর্বল। নিয়মের ধারাবাহিকতা আর দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি নিশ্চিত হলে সংখ্যাটা বদলাতে বেশি সময় লাগবে না। কোম্পানি গঠনের ধাপগুলো দেখুন: বাংলাদেশে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি খুলতে কী কী লাগে।

তথ্যসূত্র

  1. লজ অব বাংলাদেশ, The Foreign Private Investment (Promotion and Protection) Act, 1980 — লিংক
  2. লজ অব বাংলাদেশ, সালিস আইন, ২০০১ — লিংক
  3. দ্য ডেইলি স্টার, “BB eases repatriation rules for foreign investors”, ১০ মার্চ ২০২৬ — লিংক
  4. দ্য ডেইলি স্টার, “Over 46 lakh cases pending across courts in Bangladesh: Law minister”, ৭ জুলাই ২০২৬ — লিংক
  5. দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, “Commercial Court Act needs re-examination: Law minister”, ২২ মে ২০২৬ — লিংক
  6. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Bangladesh net FDI inflows rise 39.36% to $1.77b in 2025”, ১৪ মে ২০২৬ — লিংক
  7. বিডিনিউজ২৪, “FICCI calls budget ‘positive’ but raises concerns over investment environment”, ১২ জুন ২০২৬ — লিংক
  8. দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, “New tax policies will push back FDI from Bangladesh: FICCI”, ১০ জুন ২০২৪ — লিংক
  9. বেপজা, “Why BEPZA” — লিংক

এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য ও মতামত, বিনিয়োগ বা আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। বৈদেশিক মুদ্রার নিয়ম সময়ে সময়ে বদলায়; লেনদেনের আগে ব্যাংক ও পেশাদার পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

ইমেইল অথবা মোবাইল — যেকোনো একটি দিলেই হবে। কোনোটিই প্রকাশ করা হয় না।