মামলা ৬২ শতাংশ কমেছে। বিরোধও কি ততটা মিটেছে?
ভাইয়ে ভাইয়ে জমির ভাগ নিয়ে ঝগড়া, স্ত্রীর দেনমোহর বা ভরণপোষণের দাবি, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খরচ নিয়ে সন্তানদের মধ্যে টানাটানি। এমন বিরোধে এত দিন প্রথম পদক্ষেপ ছিল আদালতে মামলা। এখন অনেক জেলায় মামলার আগে যেতে হবে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে, মধ্যস্থতার জন্য।
সরকারের হাতে এর একটা চমৎকার ফলও আছে: যেসব জেলায় এটা চালু হয়েছে, সেখানে নতুন মামলা দায়ের কমেছে গড়ে ৬২.০২ শতাংশ। সংখ্যাটা সম্ভবত সঠিক। প্রশ্ন হলো, এটা আসলে কী মাপছে।
মূল কথা
- আইনগত সহায়তা প্রদান আইনের ২০২৫ সালের সংশোধনীতে কিছু বিরোধে মামলার আগে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক হয়; ৯ এপ্রিল ২০২৬ সংসদ সংশোধনী বিল পাস করে।
- ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২ জেলায় শুরু, পরে ২০ জেলায়; ২১ জুলাই ২০২৬ আরও ১০ জেলা যুক্ত হয়ে এখন প্রায় ৩০ জেলায় চালু।
- ২১ জুলাই ২০২৬ আইনমন্ত্রী জানান, ফেব্রুয়ারি–মে ২০২৬-এ আগের বছরের তুলনায় এসব জেলায় নতুন মামলা গড়ে ৬২.০২ শতাংশ কমেছে।
- কতগুলো মধ্যস্থতা মীমাংসায় পৌঁছাল আর মীমাংসা কতটা মানা হলো, সেই তথ্য এখনো প্রকাশ হয়নি।
নিয়মটা কী
আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ (১ জুলাই ২০২৫) আইনে দুটি নতুন ধারা যোগ করে। ২১খ ধারায় তফসিলভুক্ত কিছু বিরোধে মামলার আগে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক হয়। ২১গ ধারায় মীমাংসা হলে প্রধান লিগ্যাল এইড অফিসারের প্রত্যয়নের পর তা পক্ষগুলোর ওপর বাধ্যকর হয়। মধ্যস্থতায় কাটানো সময় তামাদির হিসাব থেকে বাদ যায়, তাই মধ্যস্থতায় গেলে মামলার সময়সীমা হারানোর ভয় নেই।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী আওতায় আছে পারিবারিক আদালতের বিষয় (দেনমোহর, ভরণপোষণ ইত্যাদি), বাটোয়ারা মামলা, অগ্রক্রয় (প্রি-এমশন), যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনের মামলা, আর বাড়িভাড়ার মতো কিছু বিরোধ। নিজের বিরোধ তফসিলে পড়ে কি না, মামলার আগে লিগ্যাল এইড অফিস থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
৬২ শতাংশের ভেতরে কী আছে
২১ জুলাই ২০২৬ আইনমন্ত্রী যে হিসাব দেন, তাতে পারিবারিক আদালতের মামলা ৩,৫৫৯ থেকে নেমে ১,৭৪৪, বাটোয়ারা মামলা ২,০০১ থেকে ৬৬১, যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা ৫,৬০৫ থেকে ১,৮১০, আর অগ্রক্রয়ের মামলা ১৭ থেকে ২। সব মিলিয়ে গড়ে ৬২.০২ শতাংশ কম।
কিন্তু একজন মানুষ আদালতে গেলেন না, এর পেছনে অন্তত চারটা কারণ থাকতে পারে। এক, বিরোধটা মধ্যস্থতায় মিটে গেছে। দুই, মধ্যস্থতায় মেটেনি, কিন্তু নতুন করে মামলা করার শক্তি বা টাকা আর নেই। তিন, বাড়তি একটা ধাপ দেখে শুরুতেই হাল ছেড়েছেন। চার, দুর্বল পক্ষ চাপে পড়ে এমন শর্তে রাজি হয়েছেন, যা আদালতে টিকত না।
প্রথমটা সাফল্য, বাকি তিনটা নয়। অথচ চারটাই একই হিসাবে “মামলা কমেছে” হিসেবে জমা পড়ে।
যে তিনটা সংখ্যা দরকার
- মীমাংসার হার: কতগুলো মধ্যস্থতা আসলে মীমাংসায় পৌঁছাল।
- পালনের হার: মীমাংসার কত শতাংশ ছয় মাস পরেও মানা হচ্ছে। কাগজে সই আর টাকা হাতে পাওয়া এক জিনিস নয়।
- ঝরে পড়ার হার: মীমাংসা ব্যর্থ হওয়ার পর কতজন সত্যিই আদালতে গেলেন।
তিনটা তথ্যই লিগ্যাল এইড অফিসের রেজিস্টারে আছে। দায়েরের সংখ্যা যে যত্নে দুই দশমিক ঘর পর্যন্ত হিসাব হয়, এগুলোও সেভাবে প্রকাশ করা যায়।
দুই দিকের কথা
সমর্থনের যুক্তি শক্ত। মধ্যস্থতায় মেটা বিরোধ অনেক কম খরচে, কম সময়ে মেটে, সম্পর্কও পুরোপুরি ভাঙে না। প্রধান বিচারপতি এই উদ্যোগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মামলা থেকে সমঝোতার পথে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। আর যে দেশে বিচারাধীন মামলা ৪৫ লাখের মতো, সেখানে জট কমানোর যেকোনো কার্যকর পথ গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্বেগও আছে। অধিকারকর্মীরা বলেছেন, যৌতুক বা নির্যাতনের মতো বিরোধে ভুক্তভোগী নারী চাপে পড়ে আপসে বাধ্য হতে পারেন। জেলাপ্রতি লিগ্যাল এইড অফিস একটি, কর্মকর্তা কম, আর মধ্যস্থতাকারীর প্রশিক্ষণ ও মান নিয়েও প্রশ্ন আছে।
আমার মত হলো, লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া আর তথ্য প্রকাশ করা আলাদা জিনিস। কাউকে নির্দিষ্ট শতাংশ মীমাংসা করতে বাধ্য করার দরকার নেই; যা হচ্ছে, সেটা প্রকাশ করলেই চলে। আর কর্মসূচিটা যখন নতুন নতুন জেলায় ছড়াচ্ছে, মাপার সঠিক নিয়ম ঠিক করার সময় এখনই।
আপনার বিরোধ হলে যা করবেন
- আপনার জেলায় বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা চালু কি না আর আপনার বিরোধ তফসিলে পড়ে কি না, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে বা সরকারি আইনগত সহায়তার টোল-ফ্রি হেল্পলাইন ১৬৪৩০-এ জেনে নিন।
- আবেদনের সঙ্গে বিরোধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, দুই পক্ষের ঠিকানা আর প্রাসঙ্গিক কাগজ (কাবিননামা, দলিল, খতিয়ান ইত্যাদি) দিন। কপি রাখুন।
- মধ্যস্থতায় রাজি না থাকলেও নির্ধারিত দিনে উপস্থিত থেকে নিজের অবস্থান জানান; প্রক্রিয়া এড়িয়ে গেলে পরে মামলা করতে গিয়ে জটিলতা হতে পারে।
- মীমাংসার শর্ত পুরোপুরি বুঝে তবেই সই করুন। টাকা কবে, কীভাবে, কার হাতে দেওয়া হবে, লিখিত থাকুক।
- ভয়, হুমকি বা নির্যাতনের পরিস্থিতিতে চাপে পড়ে আপস করবেন না; লিগ্যাল এইড কর্মকর্তাকে বিষয়টা স্পষ্ট করে বলুন, আর নিজের সুরক্ষাকে আগে রাখুন।
- মীমাংসা না হলে লিগ্যাল এইড অফিস থেকে মধ্যস্থতা ব্যর্থ হওয়ার লিখিত কাগজ নিয়ে আদালতে যান। মধ্যস্থতার সময়টা তামাদি থেকে বাদ যায়, তবু বাকি সময়সীমা হিসাব করে দেরি করবেন না।
শেষ কথা
মামলার আগে মধ্যস্থতা ভালো ধারণা, আর অনেকের জন্য এটা সত্যিকারের স্বস্তি। কিন্তু কর্মসূচিটা সফল কি না, তা বোঝা যাবে কতগুলো মামলা কম হলো তা দিয়ে নয়, কতগুলো বিরোধ ন্যায্যভাবে মিটল তা দিয়ে। ব্যবসায়িক বিরোধে মধ্যস্থতার নিয়ম নিয়ে পড়ুন: ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত: “৯০ দিনে বিচার” আসলে কী বলে।
তথ্যসূত্র
- লজ অব বাংলাদেশ, আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ — লিংক
- এনটিভি, “আইনগত সহায়তা প্রদান সংশোধনী বিল-২০২৬ পাস”, ৯ এপ্রিল ২০২৬ — লিংক
- দ্য ডেইলি স্টার, “Mandatory pre-case mediation launched in 12 districts”, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ — লিংক
- মানবজমিন, “মামলাজট নিরসনে মধ্যস্থতা কার্যক্রম আশাব্যঞ্জক ফল দিচ্ছে: আইনমন্ত্রী”, ২১ জুলাই ২০২৬ — লিংক
- ঢাকা ট্রিবিউন, “Law minister: Mediation yielding encouraging results in reducing case backlog”, ২১ জুলাই ২০২৬ — লিংক
- দ্য ডেইলি স্টার, “Legal Aid Services (Amendment) Ordinance 2025”, ২৩ জুলাই ২০২৫ — লিংক
- প্রথম আলো, “মামলা শুরুর আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কমাবে”, ১৪ জুলাই ২০২৫ — লিংক
- বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর, ওয়েবসাইট (হেল্পলাইন ১৬৪৩০) — লিংক
এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য ও মতামত, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। কোন জেলায় ও কোন বিরোধে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক, তা সময়ে সময়ে বদলায়; জেলা লিগ্যাল এইড অফিস থেকে জেনে নিন।

অ্যাকাউন্ট থাকলে প্রতিবার তথ্য লিখতে হয় না, আর মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। লগইন বা নিবন্ধন করুন