চেক ডিজঅনার মামলা: ব্যাংকে জমা রাখা ফাঁকা চেকে কি মামলা চলে?
ঋণ নেওয়ার সময় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রায়ই কয়েকটা সই করা ফাঁকা চেক রেখে দেয়। বলা হয়, “জামানত হিসেবে থাকল।” বছর কয়েক পর কিস্তি আটকে গেলে সেই চেকে টাকার অঙ্ক বসে, ব্যাংকে জমা পড়ে, ফেরত আসে। তারপর আসে উকিল নোটিশ, আর চেক ডিজঅনারের মামলা।
তখন অনেকেরই প্রশ্ন: আমি তো কোনো নির্দিষ্ট টাকার জন্য চেকটা দিইনি, তাহলে মামলা হয় কীভাবে? এই প্রশ্নের একটা উত্তর হাইকোর্ট দিয়েছিলেন ২০২২ সালে। কিন্তু সেই উত্তর এখনো চূড়ান্ত হয়নি, আর সেখানেই আটকে আছে বহু মামলার ভাগ্য।
মূল কথা
- হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনার ফৌজদারি অপরাধ। সাজা সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড, চেকের অঙ্কের তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানা, বা দুটোই।
- ২৩ নভেম্বর ২০২২ হাইকোর্ট বলেন, ঋণের জামানত হিসেবে নেওয়া চেকে ব্যাংক ১৩৮ ধারার মামলা করতে পারবে না। ১ ডিসেম্বর ২০২২ আপিল বিভাগ রায়টি স্থগিত করেন।
- জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী আপিল এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, প্রশ্নটা খোলা।
- ২০২৬ সালের সংশোধনীতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চেকের মামলা এখন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে, তার বেশি হলে যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে।
১৩৮ ধারা আসলে কী বলে
হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার কাঠামো সহজ। চেক ব্যাংকে জমা দিতে হয় ছয় মাসের মধ্যে, বা চেকের মেয়াদের মধ্যে, যেটা আগে শেষ হয়। ডিজঅনার হলে ব্যাংকের খবর পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেকদাতাকে লিখিত নোটিশ দিতে হয়। নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে টাকা না দিলে অপরাধ সম্পূর্ণ। এরপর এক মাসের মধ্যে আদালতে নালিশ করতে হয় (ধারা ১৪১)।
সাজা হলে আপিল করতে চেকের অঙ্কের অন্তত ৫০ শতাংশ জমা দিতে হয় (ধারা ১৩৮ক)। আর ২০২৬ সালের সংশোধনী অনুযায়ী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চেকের মামলা বিচার করবেন মেট্রোপলিটন বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট; তার বেশি হলে যুগ্ম দায়রা জজ বা তার ঊর্ধ্বতন আদালত।
একটা বিষয় পরিষ্কার থাকা ভালো। এটা ফৌজদারি মামলা। জিতলে আদালত সাজা দেন; জরিমানার টাকা থেকে পাওনাদার অর্থ পেতে পারেন, কিন্তু এটা মূলত টাকা আদায়ের দেওয়ানি ব্যবস্থা নয়। তবু পাওনাদাররা এই পথটাই বেশি নেন, কারণ মাথার ওপর ফৌজদারি মামলা ঝুললে মানুষ রায়ের আগেই টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করেন।
২০২২ সালের রায় আর স্থগিতাদেশ
২৩ নভেম্বর ২০২২ হাইকোর্ট বিভাগের একটি একক বেঞ্চ একটি ব্যাংকের করা চেক মামলায় দণ্ডিত এক ব্যক্তির আপিল নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বলেন: ঋণের বিপরীতে ব্যাংক যে চেক নেয়, তা জামানতের চেক, হস্তান্তরযোগ্য দলিল নয়। ঋণ আদায়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে যেতে হবে অর্থ ঋণ আদালতে। এ ধরনের বিচারাধীন মামলা নিয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংককে সব ঋণ বিমার আওতায় আনা এবং ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়ার কথাও রায়ে ছিল।
এক সপ্তাহের মাথায়, ১ ডিসেম্বর ২০২২, আপিল বিভাগ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আবেদনে রায়টি দুই মাসের জন্য স্থগিত করেন। ফলে ব্যাংকগুলো আবার এ ধরনের মামলা করতে পারছে।
তারপর? দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ৪ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী স্থগিতাদেশ এখনো বহাল, প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসা হয়নি। একই প্রতিবেদন বলছে, নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার চেক মামলা বিচারাধীন, যার অর্ধেকের বেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের করণীয় সীমিত।
এর ব্যবহারিক ফল অনিশ্চয়তা। একই ধরনের ঘটনায় কোনো আদালতে আসামি রেহাই পান, কোথাও সাজা হয়। কে কোন যুক্তি তুলছেন, আর আদালত কোন মত নিচ্ছেন, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
দুই পক্ষের যুক্তি
ব্যাংকের যুক্তি হালকা নয়। ১৩৮ ধারার চাপ না থাকলে ছোট ব্যবসায়ী আর জামানত দিতে না পারা ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পাওয়া আরও কঠিন হবে। অর্থ ঋণ আদালতের মামলা বছরের পর বছর চলে; সব মামলা সেখানে পাঠালে আদায় আরও পিছিয়ে যাবে।
ঋণগ্রহীতার যুক্তিও শক্ত। চেক দেওয়ার দিন কোনো নির্দিষ্ট দায় ছিল না; অঙ্ক বসানো হয়েছে পরে। একই ঋণের জন্য অর্থ ঋণ আদালতে মামলা, বন্ধকি সম্পত্তির নিলাম, আবার চেক মামলায় জেলের ঝুঁকি, সব একসঙ্গে চলতে পারে।
আমার মত হলো, ঋণ আদায়ের টেকসই সমাধান দ্রুত ও কার্যকর দেওয়ানি ব্যবস্থা; ফৌজদারি আদালতকে আদায়ের বিকল্প বানালে দুটো ব্যবস্থাই চাপে পড়ে। আর এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি আপিল বিভাগে বিষয়টির নিষ্পত্তি। সিদ্ধান্ত যেদিকেই যাক, একটা স্পষ্ট রায় অনিশ্চয়তার চেয়ে ভালো: ব্যাংক, ঋণগ্রহীতা আর আদালত, সবার জন্য।
নতুন ঝুঁকি: ভাড়াটে আসামি
চেক মামলার চাপ এত বেড়েছে যে এর আশপাশে প্রতারণাও জন্ম নিচ্ছে। টাকার বিনিময়ে আসল আসামির বদলে অন্য কাউকে আদালতে হাজির করানোর চক্রের কথা গণমাধ্যমে এসেছে। এভাবে অন্যের হয়ে হাজিরা দেওয়া বা দেওয়ানো নিজেই গুরুতর অপরাধ। কেউ “ঝামেলা মিটিয়ে দেওয়ার” এমন প্রস্তাব দিলে সরাসরি না বলুন।
আপনি আসামি হলে যা দেখবেন
- চেকটা কবে, কী উদ্দেশ্যে দিয়েছিলেন। ঋণের জামানত হিসেবে দিয়ে থাকলে ঋণ চুক্তি, মঞ্জুরিপত্র বা চেক জমার রসিদ খুঁজে রাখুন।
- চেকে অঙ্ক ও তারিখ কে লিখেছেন, আর লেখার লিখিত অনুমতি ছিল কি না।
- ডিজঅনারের খবর পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নোটিশ গেছে কি না, আর সঠিক ঠিকানায় গেছে কি না।
- নোটিশের ৩০ দিন পার হওয়ার পর এক মাসের মধ্যে নালিশ হয়েছে কি না।
- সমন বা ওয়ারেন্টের খবর পেলে দেরি না করে আইনজীবীর মাধ্যমে হাজির হয়ে জামিন নিন। হাজির না হলে অনুপস্থিতিতে বিচারের ঝুঁকি থাকে।
- আপসের পথ খোলা রাখুন। অনেক চেক মামলা আদালতের বাইরে টাকা পরিশোধের সমঝোতায় শেষ হয়।
আপনি পাওনাদার হলে
- ডিজঅনারের স্লিপ হাতে পেলেই তারিখ লিখে রাখুন, আর ৩০ দিনের মধ্যে নোটিশ দিন; রেজিস্টার্ড ডাকে প্রাপ্তিস্বীকারসহ পাঠানো নিরাপদ।
- নোটিশের কপি, ডাকের রসিদ আর প্রাপ্তিস্বীকার কার্ড সংরক্ষণ করুন। মামলায় প্রথম প্রশ্ন এগুলো নিয়েই আসে।
- সময়সীমা এক দিনও পার হলে মামলা টেকানো কঠিন হয়ে যায়।
- শুধু ফৌজদারি মামলার ওপর ভরসা না করে টাকা আদায়ের দেওয়ানি পথটাও ভাবুন।
শেষ কথা
ফাঁকা চেকে সই করে কাউকে দেওয়ার আগে দুবার ভাবুন। দিতেই হলে লিখিত রাখুন কী উদ্দেশ্যে দিচ্ছেন। আর মামলা হলে মাথা ঠান্ডা রেখে তারিখগুলো মিলিয়ে দেখুন; চেক মামলার অনেক কিছুই দাঁড়িয়ে থাকে সময়সীমার ওপর।
তথ্যসূত্র
- লজ অব বাংলাদেশ, হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১ (ধারা ১৩৮, ১৩৮ক, ১৪১) — লিংক
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Banks cannot file cheque dishonour case: HC”, ২৩ নভেম্বর ২০২২ — লিংক
- বাংলা ট্রিবিউন, “হাইকোর্টের রায় স্থগিত, চেক ডিজঅনারের মামলা করতে পারবে ব্যাংক”, ১ ডিসেম্বর ২০২২ — লিংক
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, “Borrowers face jail even after losing assets as banks pursue dual legal action”, ৪ জানুয়ারি ২০২৬ — লিংক
- যুগান্তর, “ঢাকার আদালতপাড়ায় ভাড়ায় মেলে আসামি”, ২৮ জুলাই ২০২৬ — লিংক
এই লেখা সাধারণ আইনি তথ্য ও মতামত, আইনি পরামর্শ নয়। তথ্য ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। নিজের মামলার বিষয়ে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।

অ্যাকাউন্ট থাকলে প্রতিবার তথ্য লিখতে হয় না, আর মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। লগইন বা নিবন্ধন করুন